লামার আদিবাসী ও রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের ভূমি বিরোধীয় এলাকা পরিদর্শনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

0
282

হিল ভয়েস, ২৬ এপ্রিল ২০২৩, বান্দরবান: বান্দরবানের লামার সরই ইউনিয়নে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ও ম্রো-ত্রিপুরা গ্রামবাসীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ নিরসনকল্পে সরেজমিনে পরিদর্শন করেন পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’র ২নং সাব-কমিটি।

আজ বুধবার (২৬ এপ্রিল ২০২৩) সকাল ১১ টার দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২নং সাব-কমিটি লামার সরই ইউনিয়নের তিনটি ম্রো ও ত্রিপুরা পাড়ায় এসে পৌঁছান।

পরির্দশন দলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একাদশ জাতীয় সংসদের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২নং সাব কমিটি’র আহবায়ক এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী (চট্রগ্রাম-০৬ আসনের সংসদ সদস্য)। এতে আরো রয়েছেন ২৯৯নং পার্বত্য রাঙামাটি আসনের এমপি দীপংকর তালুকদার, ২৯৮নং পার্বত্য খাগড়াছড়ি আসনের এমপি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও তিন পার্বত্য জেলার সংরক্ষিত মহিলা আসনের (৩০৯ মহিলা আসন-৯) এমপি বাসন্তি চাকমা।

এ সময় বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি, জেলা পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম, লামা উপজেলা চেয়ারম্যান মো: মোস্তফা জামাল, লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোস্তফা জাবেদ কায়সার, উপজেলা আ.লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান বাথোয়াইচিং মার্মা, সরই ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইদ্রিছ কোম্পানি উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় লামা ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃক ভূক্তভোগী ম্রো-ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির লোকজন সংসদীয় কমিটির সদস্যদের স্বাগত জানান এবং “লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের অন্যায়, উৎপীড়ন ও ভূমিদস্যুতা থেকে আমাদের রক্ষা করুন” শ্লোগান সংবলিত ব্যানারসহ বিভিন্ন দাবির প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

পরিদর্শনের পর ২নং সাব কমিটির আহ্বায়ক এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা জানলাম দেখলাম। যেহেতু পার্বত্য চুক্তির পর থেকে ভূমি বন্দোবস্তি বন্ধ রয়েছে, সেহেতু বিষয়টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রয়োজনে আলোচনা করে আইন সংশোধন করে এই ৩৬টি ম্রো ও ত্রিপুরা পরিবারকে ২০০ শত ৬ একর ভূমি বন্দোবস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি দ্রুত সময়ে মিমাংসা করা দরকার, অন্যথায় সময় যত গড়াবে সবাই তত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।‘

কথোপকথনে সাব কমিটির সদস্য সাংসদ দীপঙ্কর তালুকদার জানতে চায়, এখানে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি আছে কিনা থাকলে তাদের অবস্থান কত দূরে। এই প্রশ্নের জবাবে জেলা পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম পিপিএম বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের এ রকম কোন স্থায়ী অবস্থান এখানে নেই।‘

এ সময় জনপ্রতিনিধিরা জানান, ইতোপূর্বে জেলার শীর্ষস্থানীয়দের প্রস্তাবনানুযায়ী ৩৬টি পরিবারকে ৫ একর করে ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শ্মশানের জন্য মোট ২০০ শত ৬ একর জমি প্রদানের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু ম্রো ও ত্রিপুরা গ্রামবাসীরা প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন।

এ সময় গজালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এই বিরোধের জন্য কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ও লামা রাবার কোম্পানীকে দায়ী করে বলেন, উভয় প্রতিষ্ঠানের জমি পরিমাপ করা হলে বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারে ক্ষতিগ্রস্ত ম্রো ও ত্রিপুরা গ্রামবাসীরা ম্রো এবং ত্রিপুরাদের ৪০০ একর জুম ভূমি ফেরত দেয়া; লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজসহ প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ বিনষ্টকারী সকল রাবার বাগানের ইজারা বাতিল করা; ম্রোদের একমাত্র পানির উৎস কলাইয়া ঝিড়িতে বিষ প্রয়োগ করে মানুষ ও জীব বৈচিত্র্যের হত্যার চেষ্টা এবং অশোক বৌদ্ধ বিহার হামলা, ভাংচুর ও বুদ্ধ মুর্তি লুটপাটের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার করা; ১ জানুয়ারি রেংয়েন ম্রো কার্বারী পাড়ায় অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাটের সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার করা; এবং ভূমিদস্যু লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ দেয়া মিথ্যা মামলায় আটককৃ কারাবন্দী লাংকম ম্রোকে নি:শর্ত মুক্তি দেয়া এবং ম্রো ও ত্রিপুরাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি করেছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য যে, গত ২৬ এপ্রিল ২০২২ লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃক বান্দরবানের লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের লাংকম ম্রো কার্বারি পাড়া, জয়চন্দ্র ত্রিপুরা কার্বারি পাড়া এবং রেংয়েন ম্রো কার্বারি পাড়ার আদিবাসীদের ৩৫০ একর জুম ভূমি, ফলজবাগান ও গ্রামীন বনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এতে লামার তিন গ্রামে জুম্মদের ৩৫০ একরের জুমভূমি, ফলজবাগান ও গ্রামীণ বনে অগ্নিসংযোগের ফলে ৩৯ পরিবারের ২০০ জন গ্রামবাসীর জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীর মৃত্যুসহ প্রাকৃতিক প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ভূমিদস্যু লামা রাবার ইন্ডাষ্ট্রিজের অগ্নিসংযোগ, হামলা ও ষড়যন্ত্রমূলক অপকর্ম এখানেই থেমে থাকেনি। ২৬ এপ্রিল ২০২২ হামলার পর ২০২২ সালে আরো কমপক্ষে এক ডজনের অধিক বার হামলা এবং ৩টি ষড়যন্ত্রমূলক সাজানো মামলা দায়ের করা হয়। ম্রো ও ত্রিপুরা গ্রামবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে পার্বত্য জেলা পরিষদের তদন্ত দল ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশ সত্ত্বেও লামা রাবার কোম্পানী অব্যাহতভাবে উক্ত জায়গা-জমি জবরদখল করে নিচ্ছে।

আরো পড়ুন

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ভূমি রক্ষা আন্দোলনে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে: ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটি

ঢাকায় অবস্থান ধর্মঘট, ভূমিদস্যু লামা রাবার কোম্পানির হাত থেকে তাদের রক্ষার দাবি

লামায় রেংয়েন ম্রো পাড়ার বৌদ্ধ বিহারের জায়গা দখল করে রাবার কোম্পানির ঘর নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন