সম্প্রতি পাহাড়ে বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক জুম্মদের ভূমি বেদখলের পাঁয়তারা বৃদ্ধি

0
292

হিল ভয়েস, ২৪ জুলাই ২০২৩, বিশেষ প্রতিবেদক: সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে বহিরাগত বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক স্থানীয় আদিবাসী জুম্মদের মালিকানাধীন ভোগদখলীয় ভূমি বেদখলের পাঁয়তারা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে নানা সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। সেটেলারদের কর্তৃক এসব ভূমি বেদখল পাঁয়তারায় সেনাবাহিনীর মদদ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এধরনের অন্তত চারটি স্থানে সেটেলারদের কর্তৃক জুম্মদের ভূমি বেদখলের পাঁয়তারার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বলাবাহুল্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো না কোনো এলাকায় প্রায়ই এই ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে।

মহালছড়ি: বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক জুম্মদের ভূমি বেদখলের চেষ্টার সর্ব সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাধীন মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নে গত ২১ জুলাই ২০২৩ তারিখে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঐদিন বেলা ২টার দিকে লেমুছড়ি এলাকার মোঃ আব্দুল লতিফ, পিতা-কাশেম মন্ডল নামে এক বাঙালি সেটেলার জয়সেন পাড়ায় নতুন নির্মিত সেনা ক্যাম্প থেকে ৩০ জনের একদল সেনা সদস্য নিয়ে পার্শ্ববর্তী জুম্ম অধ্যুষিত বদানালা গ্রামে যায়।

এসময় মোঃ আব্দুল লতিফের পরামর্শে সেনা সদস্যরা জুম্মদের কয়েকটি বাড়ি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। উল্লেখ্য, কয়েক মাস আগেও সেটেলার বাঙালিরা ভূমি বেদখলের উদ্দেশ্যে উক্ত এলাকার জুম্মদের উপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন জুম্ম আহত হয় এবং কয়েকটি বাড়ি পুড়ে যায়। পরে পুড়ে যাওয়া ওই বাড়ি জুম্মরা মেরামত করেন।

এদিকে সেনাবাহিনী কর্তৃক জুম্মদের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টার কথা জানাজানি হলে, এলাকাবাসী, বিশেষ করে নারীরা ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসেন এবং তারা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। নারীদের এই প্রতিবাদের মুখে সেনা সদস্যরা তাদের প্রচেষ্টা বন্ধ করেন। এসময় সেনা সদস্যরা নারীদের কাছে ‘বাড়িগুলো কখন নির্মাণ করা হয়েছে’ জানতে চাইলে, নারীরা ‘তারা এখানে বহু বছর ধরে বসবাস করছেন’ বলে জানান। এরপর সেনা সদস্যরা আর কিছু না বলে পরে সেখান থেকে চলে যান।

এসময় ঘটনাস্থলে বদানালা গ্রামের কার্বারি অনন্ত বিকাশ চাকমা ও ৪নং মাইসছড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার গুণসিন্ধু চাকমা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়।

মাটিরাঙ্গা: গত ১৭ জুলাই ২০২৩ সকালের দিকে খাগড়াছড়ি জেলাধীন মাটিরাঙ্গা উপজেলার মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়ন এলাকায় মুসলিম বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক স্থানীয় জুম্মদের ভূমি বেদখলের চেষ্টা করার অভিযোগ পাওয়া যায়। ঘটনাটি ঘটে মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের ওয়াসু মৌজার পূর্ব তৈকুম্ভা পাড়া এলাকায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঐদিন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে পার্শ্ববর্তী সেটেলার এলাকার ৮-১০ জনের মুসলিম বাঙালি সেটেলারদের একটি দল পূর্ব তৈকুম্ভা পাড়া এলাকায় গিয়ে জুম্মদের মালিকানাধীন প্রথাগত জায়গায় জঙ্গল পরিষ্কার করা শুরু করে। এক পর্যায়ে ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় জুম্ম নারী-পুরুষরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং জঙ্গল কাটারত সেটেলারদের জঙ্গল কাটতে বাধা প্রদান করে। জুম্মদের ব্যাপক প্রতিরোধ দেখে বাঙালিরা সেটেলাররা সেখান থেকে চলে যায়।

লংগদু: একই দিন (১৭ জুলাই ২০২৩) রাঙ্গামাটি জেলাধীন লংগদু উপজেলার ভাসন্যাদম ইউনিয়নেও মুসলিম বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক জোরপূর্বক জুম্মদের মালিকানাধীন প্রথাগত ভূমি বেদখলের পাঁয়তারা চালানো এবং এই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ফলজ গাছ সহ জঙ্গল পরিষ্কার করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঐদিন সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে লংগদুর ৫নং ভাসন্যাদম ইউনিয়নের ১৭নং ঘনমোড় মৌজার অন্তর্গত শীলকাটা ছড়া সেটেলার বসতি এলাকার ২০-২২ জনের বাঙালি সেটেলারদের একটি দল শীলকাটা ছড়া গ্রামে জুম্মদের মালিকানাধীন প্রথাগত ভূমিতে ফলজ গাছ সহ জঙ্গল পরিষ্কার করা শুরু করে।

বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক জঙ্গল পরিষ্কার করার ঘটনা জানাজানি হলে ভূমির মালিক জুম্মরা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যান এবং তাদের জায়গায় বাঙালি সেটেলারদের জঙ্গল পরিষ্কার করতে নিষেধ করেন। কিন্তু বাঙালি সেটেলাররা জুম্মদের নিষেধ তোয়াক্কা না করে জুম্মদের রোপণকৃত আম, লিচু ও আমলকি গাছ সহ কমপক্ষে ২ একর পরিমাণ জায়গার জঙ্গল পরিষ্কার করে চলে যায়।

যাওয়ার সময় বাঙালি সেটেলাররা উক্ত জায়গাটি ভূমি বেদখলের চেষ্টায় নেতৃত্বদানকারী শীলকাটাছড়া সেটেলার এলাকার বাসিন্দা মোঃ হোসেন এর জায়গা বলে দাবি করে উল্টো বিভিন্ন হুমকি দিয়ে যায়।

কাপ্তাই: গত ৩ জুলাই ২০২৩ রাঙ্গামাটি জেলাধীন বিলাইছড়ি উপজেলার ২নং কেংড়াছড়ি ইউনিয়নে বসবাসকারী বহিরাগত বাঙালি সেটেলাররা পার্শ্ববর্তী কাপ্তাই উপজেলার ৪নং কাপ্তাই ইউনিয়ন এলাকায় ১২ জুম্ম পরিবারের অন্তত ২৪ একর জলেভাসা ধান্য জমি জোরপূর্বক বেদখলের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেটেলারদের এই বেদখল প্রচেষ্টায় সেনাবাহিনীর উস্কানি রয়েছে বলেও একটি সূত্রে জানা যায়।

এমনকি বাঙালি সেটেলাররা জুম্মদেরকে তাদের জমিতে চাষের কাজে বাধা দিচ্ছে এবং কাজ বন্ধ না করলে রক্তপাত হবে বলেও হুমকি দিচ্ছে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৩০ নং বারুদগোলা মৌজার কাপ্তাই ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের কিল্ল্যাছড়ি ভাবনা কেন্দ্র পাড়া গ্রামের অধিবাসী পুলক কুমার তঞ্চঙ্গ্যা (৩৪) পীং-নোয়া মুনি তঞ্চঙ্গ্যা ও একই গ্রামের দয়া মন চাকমা (৬৮) পীং-মৃত কিনাধন চাকমা, তাদের জলেভাসা জমি সংস্কারের জন্য বিশ জন শ্রমিক নিয়ে কাজ করতে যায়।

এমন সময় পার্শ্ববর্তী বিলাইছড়ি উপজেলার ২নং কেংড়াছড়ি ইউনিয়নের কেংড়াছড়ি সেটেলার এলাকা হতে বর্তমান ইউপি মেম্বার মোঃ রবিউল, পীং-মৃত রফিকুল এর নেতৃত্বে ৪০/৫০ জন সেটেলার বাঙালি সেখানে গিয়ে পুলক কুমার তঞ্চঙ্গ্যা ও দয়া মন চাকমাকে এবং তাদের শ্রমিকদের জমিতে কাজ করতে পারবে না বলে জানায় এবং কাজ বন্ধ না করলে রক্তপাত হবে বলে জানিয়ে দেয়।

এসময় সেটেলার বাঙালিরা জুম্মদের হুমকি দিয়ে বলে যে, পার্শ্ববর্তী সব জমি তাদের হেফাজতে থাকবে, না হয় গণহত্যা চলবে। সেটেলার বাঙালিরা আরও বলে যে, তারা স্থানীয় সেনা জোনের সিও (কমান্ডিং অফিসার) এর নিকট গিয়ে মামলা করবে এবং সিও সাহেব নাকি এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দেবে।

পুলক কুমার তঞ্চঙ্গ্যা ও দয়া মন চাকমাসহ ১২টি জুম্ম পরিবারের জমি সেটেলারদের বেদখলের চেষ্টার হুমকিতে রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এর আগেও গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সেনাবাহিনীর বীর ৩২ বেঙ্গল এর সিও লেঃ কর্নেল মোঃ আহসান হাবিব নাসীম এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ২নং কেংড়াছড়ি ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড মেম্বার মহর আলী ও ২নং ওয়ার্ড মেম্বার নজরুল এর নেতৃত্বে একদল সেটেলার বাঙালি কিল্ল্যাছড়ি ভাবনা কেন্দ্র পাড়া গ্রামের ১২ জুম্ম গ্রামবাসীর প্রায় ৩৪ একর জলেভাসা জমি জোরপূর্বক বেদখল করা হয়। বেদখল করা ঐ জমি জুম্মদের বঞ্চিত করে সেনাবাহিনী ও সেটেলার নেতাদের কর্তৃক প্রায় ৪০/৫০টি সেটেলার বাঙালি পরিবারকে প্রদান করা হয়।