লংগদুতে জুম্ম কৃষকদের ব্যাপক ফসল নষ্ট করে এলজিইডি’র খাল খনন

0
359

হিল ভয়েস, ৬ এপ্রিল ২০২৩, রাঙামাটি: লোকাল গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট (এলজিইডি) কর্তৃক রাঙামাটি জেলাধীন লংগদু উপজেলার গুলশাখালী ইউনিয়নে ৩০টি আদিবাসী জুম্ম কৃষক পরিবারের রোপণকৃত ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে খাল খনন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের সাথে কোনো প্রকার আলোচনা, মতামত, সম্মতি ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ব্যতিরেকেই এলজিইডি এই প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, এই প্রকল্পের নাম ‘যুবলক্ষী পাড়া রাজনগর খাল উপ-প্রকল্প, যার মোট দৈর্ঘ্য ৬৪৪৯ মিটার।

দীর্ঘদিন ধরে পার্শ্ববর্তী মুসলিম বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক জুম্মদের জমি ও ভূমি বেদখলের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এলজিইডি এই খাল খনন প্রকল্প শুরু করেছে বলে স্থানীয় জনগণ ধারণা করছেন।

গত ৪ এপ্রিল ২০২৩ সকাল ৮টা থেকে এই খাল খনন কাজ শুরু করা হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় জনগণের প্রতিবাদ সত্ত্বেও গতকালও (৫ এপ্রিল) সারাদিন এই খাল খনন কাজ অব্যাহত থাকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লংগদুর ৩নং গুলশাখালী ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত যুবলক্ষী পাড়া গ্রামের (শান্তিনগর) ৩০টি জুম্ম কৃষক পরিবারের রোপনকৃত ফসল নষ্ট করে ২৪ ফুট প্রস্থ, ১০ ফুট গভীর ও ৬৪৪৯ মিটার দৈর্ঘ্য এই ‘গুলশাখালী ছড়া’ নামে একটি খাল খনন করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, এতে ৩০টি জুম্ম কৃষক পরিবারের কমপক্ষে ১২/১৩ একর জমির ফসল নষ্ট হবে।

এব্যাপারে খোঁজ নিলে স্থানীয় জনগণ জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ জুম্মদের চাষাবাদযোগ্য ধান্য জমিগুলো সেটেলার বাঙালিরা জবরদখল করার জন্য পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পাহাড়ি-বাঙালি বসতির একটি সীমারেখা নির্ধারণ এবং দীর্ঘ বছর যাবৎ পাহাড়িদের ভোগদখলে থাকার কারণে সেটেলার বাঙালিরা সেটা করতে পারছিল না।

কিন্তু বিগত ২০০৩-২০০৪ সালে গুলশাখালী ছড়ার উপর মহেন্দ্র চাকমার ‘দুই টিলার মাঝখানের জায়গায় কৃষি ও সেচবাঁধ দিয়ে পাহাড়িদের চাষাবাদযোগ্য ধান্য জমিগুলো যাহাতে পানিতে তলিয়ে যায় এবং চাষাবাদের অযোগ্য হয় সেই চেষ্টা করেছিল সেটেলার বাঙালিরা। কিন্তু পাহাড়িদের তীব্র বাধা প্রদানের মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

তার পরবর্তীতে প্রস্তাবিত স্থানটি পরিবর্তন করে নবীন চাকমা-বীরেন্দ্র লাল চাকমার দুই টিলা’র মাঝখানে বাংলাদেশ এগ্রিকালটারাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর তত্ত্ববধানে গুলশাখালী ছড়া গতি রোধ করে কৃষি সেচ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু উক্ত বছরেই বর্ষার মৌসুমে বাঁধটি ভেঙ্গে যায় এবং বাঁধের নীচে জুম্মদের চাষাবাদযোগ্য ধান্য জমিগুলো অকেজো হয়ে পড়ে।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় জুম্মদের অভিযোগ, বর্তমানেও একই উদ্দেশ্যে জুম্মদের বাধা প্রদান সত্ত্বেও তা তোয়াক্কা না করে সেটেলারদের স্থানীয় ১০/১৫ জনের একটি চক্রের তত্ত্বাবধানে এলজিইডি’র অর্থায়নে ছড়াটি গভীরভাবে খনন করে দুইপাশে জুম্মদের চাষাবাদযোগ্য ধান্য জমি ও রোপনকৃত ফসল নষ্ট করা হচ্ছে। এটা ভুক্তভোগী আদিবাসী জুম্ম পরিবারদের গুলশাখালী এলাকা থেকে উদ্বাস্তু করার ষড়যন্ত্র মনে করছেন স্থানীয় জনগণ।

ছড়াটি খননের ফলে ক্ষতির সম্মুখীন জুম্মপরিবারগুলো হচ্ছে-

১। তুষার চাকমা, পিতা-মহেন্দ্র চাকমা, ২। বিমল কান্তি চাকমা, পিতা-শারদ চন্দ্র চাকমা ৩। রাজ মোহন চাকমা, পিতা-চিগন্নে চাকমা, ৪। কিনা ধন চাকমা, পিতা-রাজ মোহন চাকমা, ৫। ক্লিনটন চাকমা, পিতা-অজ্ঞাত, ৬। সোনাবী চাকমা, স্বামী-মেনশন চাকমা, ৭। সুচেন চাকমা, পিতা-ভুলসিং চাকমা, ৮। শরৎ চন্দ্র চাকমা, পিতা-মদন কুমার চাকমা, ৯। রবি রায় চাকমা, পিতা-ভরত কুমার চাকমা, ১০। অজয় চাকমা, পিতা-ভরত কুমার চাকমা, ১১। সন্তোষ চাকমা, পিতা-ভুলসিং চাকমা, ১২। আলো জ্যোতি চাকমা, পিতা-প্রভাত চন্দ্র চাকমা, ১৩। কালাচিজি চাকমা, পিতা-চন্ডি চরণ চাকমা, ১৪। উদয়ন চাকমা, পিতা-জগৎ মোহন চাকমা, ১৫। আনন্দ মোহন চাকমা, পিতা-কামিনী চন্দ্র চাকমা, ১৬। রসিক মোহন চাকমা, পিতা-কামিনী চন্দ্র চাকমা, ১৭। সুজয় চাকমা, পিতা-সোনারাম চাকমা, ১৮। শান্তি লাল চাকমা, পিতা-শুদ্ধধন চাকমা, ১৯। রিপন বিকাশ চাকমা, পিতা-বিমল কান্তি চাকমা, ২০। সুচারন দেওয়ান, পিতা-দীপ্ত দীপক দেওয়ান, ২১। ইত্তুক্কে চাকমা, পিতা- পরান ধন চাকমা, ২২। সুমতি কুমার চাকমা, পিতা-নিশি চন্দ্র চাকমা, ২৩। রিপন চাকমা, পিতা-রবীন্দ্র চাকমা, ২৪। নবীন চাকমা, পিতা-কামিনী চন্দ্র চাকমা, ২৫। শারদ চন্দ্র চাকমা, পিতা-কৈলাশ চন্দ্র চাকমা, ২৬। রনজিতা চাকমা, স্বামী-অয়ন্তি ময় চাকমা, ২৭। কমলা রঞ্জন চাকমা, পিতা-গুলু চাকমা, ২৮। সুমেন চাকমা, পিতা-সজীব চাকমা, ২৯। শুদ্ধধন চাকমা, পিতা-নিগিরা চন্দ্র চাকমা ও ৩০। রনজিত চাকমা, পিতা-রমনী রঞ্জন চাকমা, সর্বসাং- যুবলক্ষী পাড়া, ৩নং গুলশাখালী ইউনিয়ন, লংগদু।