রামুর বৌদ্ধ বিহারে আবারো দুর্বৃত্তদের অগ্নিসংযোগ: বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের উদ্বেগ

0
222

হিল ভয়েস, ৭ জানুয়ারি ২০২৪, কক্সবাজার : কক্সবাজার জেলার রামু সদরে উসাইচেন (বড় ক্যাং) বৌদ্ধ বিহারে আবারো আগুন দিয়ে নাশকতার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) রাত আড়াইটার দিকে রামুর চেরাংঘাটায় রাখাইন সম্প্রদায়ের বড় ক্যাং খ্যাত বৌদ্ধ বিহারের সিঁড়িতে আগুন লাগায় দুর্বৃত্তরা। তবে এলাকাবাসী ও রামু ফায়ার সার্ভিসের হস্তক্ষেপে ভয়াবহ নাশকতা থেকে বিহারটি রক্ষা পেলেও বিহারের মূল ফটকের সিড়িটি আগুনে পুড়ে যায়।

বিহারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ২ টা ৬ মিনিটে মুখোশ পরা এক ব্যক্তি দেওয়াল টপকিয়ে মন্দিরের সিঁড়ি পর্যন্ত আসে। এর কয়েক মিনিট পর তাকে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখা যায়। আরো কয়েক মিনিট পর সিঁড়ির পাশ থেকে ধোঁয়া বের হয়।

চেরাংঘাটায় রাখাইন সম্প্রদায়ের উসাইচেন বৌদ্ধ বিহারের (বড় ক্যাং) পুরোহিতসহ অন্যরা রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত ২টার দিকে আগুন দেখে বিহারের ভেতরে থাকা লোকজন চিৎকার শুরু করলে এলাকাবাসী গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। পরে রামু ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মং কিউ বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে মন্দিরে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। তবে ভক্ত ও স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক প্রচেষ্টায় কাঠের তৈরি মন্দিরটি সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। একটি ছোট সিঁড়ির নিচে আগুন দেওয়া হয়েছিল। কাঠ পোড়ার শব্দ শুনে মন্দিরে থাকা ভক্তরা ঘুম থেকে উঠে আগুন নেভাতে শুরু করেন। পরে স্থানীয়রা তাদের সাথে যোগ দেয় এবং আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলে।

বিহার পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় বাসিন্দা অংথুই মং জানান, বিহারের পাশে আমার বাড়ি। রাত আড়াইটার দিকে বিহারে আগুন লেগেছে বলে আমাকে ফোন করেন বৌদ্ধ ভিক্ষু (বিহার অধ্যক্ষ)। সাথে সাথে লোকজন ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে অবশ্য রামু ফায়ার সার্ভিসের দমকল বাহিনীও ঘটনাস্থলে আসে।

রামু প্রেস ক্লাবের সভাপতি নীতিশ বড়ুয়া এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, রামু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ। এ সম্প্রীতি নষ্ট করতে ২০১২ সালে রামুসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বৌদ্ধ বিহারগুলোতে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সে ক্ষত কাটিয়ে সকল সম্প্রদায় মিলেমিশে রয়েছি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তরা নতুন করে সম্প্রীতি নষ্টে নাশকতা সৃষ্টির অপচেষ্ঠা করেছে।

জাতীয় হিন্দু মহাজোট কক্সবাজারের সভাপতি বুলবুল তালুকদার বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে এটি পরিকল্পিত নাশকতা বলে মনে করছি। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম বলেন, আমরা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে, তদন্ত পূর্বক আইনী ব্যবস্থা নেব।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। উপজেলার সব বিহারে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। তদন্ত করে আইনী ব্যবস্থাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল শনিবার (৬ জানুয়ারি) বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়’র সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, কক্সবাজারের রামুর বড় ক্যাং নামে পরিচিত কাঠের তৈরি বিহারটিতে গত ৫ জানুয়ারি রাত ২টার দিকে আগুন দিয়ে নাশকতার চেষ্টা চালিয়েছে মৌলবাদী গোষ্ঠী। আগুনে বিহারের কাঠের সিঁড়ি পুড়ে গেছে। তবে ভয়াবহ নাশকতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে রামু থানার ঐতিহ্যবাহী চেরাংঘাটা উসাইসেন বৌদ্ধ বিহার।

১২ বছর আগে রামুর বৌদ্ধ বিহার জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা স্মরণ করে বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা আগুন দিয়ে বিহারটি পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই নিন্দনীয় ঘটনার জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন-এর সভাপতি প্রকৌশলী দিব্যেন্দু বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর উত্তম বড়ুয়া নামে ফেসবুক আইডিতে কোরআন অবমাননার ছবি ছড়ানোর গুজব রটিয়ে রামু বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। হামলায় ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। একইসঙ্গে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ৩০টি বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। হামলায় রামু, উখিয়া ও টেকনাফে ১৮টি মামলায় ৯৯৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়া হলেও বিগত ৯ বছরেও ১টি মামলারও বিচার হয়নি।