মার্চ-মে মাসে সেনাবাহিনীর ২৪টি ঘটনায় ৪৯জন জুম্ম মানবাধিকার লংঘনের শিকার: জেএসএস

0
857

হিল ভয়েস, ১১ জুন ২০২২, বিশেষ প্রতিবেদক: পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএ) তার সর্বশেষ পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর এক প্রতিবেদনে বিগত তিন মাসে (মার্চ-মে ২০২২) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত ২৪টি ঘটনায় ৪৯ জন জুম্ম মানবাধিকার লংঘনের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে। এ নিয়ে ২০২২ সালের বিগত পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক মোট ৫২টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হলো এবং ১২৮ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হলো বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আজ পিসিজেএস’এর সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা স্বাক্ষরিত ‘মার্চ-মে ২০২২: পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর প্রতিবেদন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এইসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের পরিবর্তে বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকদের মতো সামরিক উপায়ে পার্বত্য সমস্যা সমাধানের কার্যক্রম জোরদার করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেদনে সরকার কর্তৃক চুক্তি লংঘন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এপিবিএন মোতায়েন, বাঙালি সেটেলারদের কর্তৃক জুম্ম নারীর উপর সহিংসতা, জুম্মর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভূমি বেদখলের অপচেষ্টা, সেনামদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের কর্তৃক হত্যা ও অপহরণের ঘটনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

পিসিজেএসএস’এর সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি নিম্নরূপঃ

“মার্চ-মে ২০২২: পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর প্রতিবেদন

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের পরিবর্তে বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকদের মতো সামরিক উপায়ে পার্বত্য সমস্যা সমাধানের কার্যক্রম জোরদার করেছে। সরকারের সেই হীনতৎপরতারই অংশ হিসেবেই সম্প্রতি ৩০টি এবিপিএন ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তজ্জন্য গত মে মাসের শেষান্তে আইন-শৃঙ্খলা সভার আয়োজন করা হয়েছে এবং সেই সভায় মন্ত্রী-সাংসদ-সামরিক আমলা কর্তৃক চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টা ধামাচাপা দিয়ে জনসংহতি সমিতিসহ চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনরত জুম্মদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও হানাহানির অভিযোগ এনে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকিমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে।

১৩ এপ্রিল ২০২২ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার্স থেকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির ৫ম বৈঠকে উপস্থাপিত প্রস্তাবাবলীরসিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের’ দোহাই দিয়ে “সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারকৃত ২৪০টি ক্যাম্পে পর্যায়ক্রমে পুলিশ মোতায়েন করা হবে” মর্মে এক নির্দেশনা জারি করা হয়। “প্রাথমিকভাবে ৩০টি ক্যাম্পে পুলিশ মোতায়েন করা হবে”বলে ঐ নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।

পার্বত্য চুক্তির ‘ঘ’ খন্ডের ১৭(ক) ধারায় পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ব্যতীত সেনা, আনসার ও ভিডিপির সকল ক্যাম্প প্রত্যাহার করা এবং ১৭(খ) ধারায় সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিকের নিকট অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করার বিধান করা হয়। কাজেই পার্বত্য চুক্তির এসব ধারা অনুযায়ী প্রত্যাহৃত ক্যাম্পের পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিক কিংবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তরের পরিবর্তে এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপন করা চুক্তির সাথে সম্পূর্ণভাবে বিরোধাত্মক ও সাংঘর্ষিক।

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে সাংসদ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়োগ দেয়ার পর এযাবত অনুষ্ঠিত পাচঁটি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রথম চারটি সভায় পার্বত্য চুক্তির উক্ত বিধানাবলী অনুসারে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে ‘পুলিশ (স্থানীয়)’ ও ‘আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ বিষয় হস্তান্তর করা ও অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন মোতাবেক পার্বত্য জেলা পুলিশ বাহিনী গঠন করার জন্য আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সরকার সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। উল্লেখ্য প্রত্যাহারকৃত অস্থায়ী ক্যাম্পের স্থলে পুলিশ ক্যাম্প বসানোর কোন সিদ্ধান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটিতে গ্রহণ করা হয়নি।

তা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পদদলিত করে প্রত্যাহৃত সেনাক্যাম্পের জায়গায় একতরফাভাবে এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপনের উদ্দেশ্যে ২৫ মে ২০২২ রাঙ্গামাটিতে উচ্চ পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা সভা এবং ২৬ মে ২০২২ এপিবিএনের আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়েছে। উল্লেখিত অনুষ্ঠানে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যর্থতাকে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে কেবলমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হানাহানির বিষয়টি ইস্যু করে বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে।

জিওসি মেজর জেনারেল সাইফুল আবেদীন তার বক্তব্যে বলেছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২টি ধারা ছিল জনসংহতি সমিতির পালনযোগ্য। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির ‘ঘ’ খন্ডের ১৩নং ও ১৪নং ধারা অনুসারে জনসংহতি সমিতির তৎকালীন সদস্যরা সকল অস্ত্র ও গোলাবারূদ জমা দেননি এবং সকল সশস্ত্র সদস্য সারেন্ডার করেননি বলে জিওসি অভিযোগ করেন। বস্তুত জিওসি’র উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মনগড়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত এবং এমনকি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সংক্রান্ত সরকারের প্রতিবেদনের সাথেও বিরোধাত্মক।

কেননা চুক্তির ১২নং ধারা মোতাবেক নির্ধারিত সময়ে জনসংহতি সমিতি তার সদস্যদের তালিকা, অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণী সরকারের নিকট জমা দিয়েছিল এবং ১৩নং ধারা মোতাবেক অস্ত্র জমাদানের দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করে অস্ত্র ও গোলাবারূদের জমাদান এবং জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য ও তাদের পরিবারবর্গ স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের কাজ সম্পন্ন করে, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনেও সম্পূর্ণরূপে ‘বাস্তবায়িত হয়েছে’ বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জিওসি তার বক্তব্যে কেবল জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে ধরেননি, তিনি চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ এনে আন্দোলনরত জনসংহতি সমিতিকে সম্মুখ যুদ্ধের আহ্বান জানান এবং ৩০ মিনিটের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি প্রদান; সেটেলার বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসনের বিষয়টি আকাশ কুসুম কল্পনা হিসেবে আখ্যায়িত করে সাম্প্রদায়িক উস্কানী প্রদান; চুক্তিতে উল্লেখিত উপজাতীয় কোটা বাতিল করে তা ‘পার্বত্য কোটা’ নামকরণ করে সেটেলার বাঙালিদেরও সেই কোটায় অন্তর্ভুক্ত করা; চাকমাদের বিরুদ্ধে উপজাতীয় কোটা অপব্যবহারের অভিযোগ ইত্যাদি চুক্তি বিরোধী, সাম্প্রদায়িক উস্কানীমূলক ও হুমকিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এমনিতর পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের উপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী মোট ২৪টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে এবং তাতে ৪৯ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। এর আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ২৮টি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল এবং তাতে ৭৯ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন। এ নিয়ে ২০২২ সালের বিগত পাঁচ মাসে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক মোট ৫২টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হলো এবং ১২৮ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হলো।

নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মার্চ-মে মাসে সংঘটিত ২৪টি ঘটনায় একজনকে বিচার-বহির্ভুত হত্যা, ২১ জনকে অবৈধ গ্রেফতার, ৭ জনকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতনসহ ২৮ জনকে মারধর ও নির্যাতন, ৬টি বাড়ি তল্লাসী ও জিনিসপত্র তছনছ, এবং ৫টি জায়গায় ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ ও এজন্য ভূমি বেদখলের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

এছাড়া মার্চ-মে মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলিম সেটেলার কর্তৃক একজন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যাসহ ৪ জন জুম্ম নারীর উপর যৌন সহিংসতা, জুম্মদের ৯টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভূমি বেদখলের উদ্দেশ্যে লামার তিন গ্রামে জুম্মদের ৩৫০ একরের জুমভূমি, ফলজ বাগান ও গ্রামীণ বনে অগ্নিসংযোগ এবং এতে ৩৯ পরিবারের ২০০ জন নারী-পুরুষ জীবন-জীবিকা, খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটের মুখে পড়া ইত্যাদি ঘটনা সংঘটিত করা হয়েছে।

অধিকন্তু সেনা-মদদপুষ্ট সংস্কারপন্থী জেএসএস, ইউডিপিএফ (গণতান্ত্রিক), মগপার্টি, বমপার্টি নামে খ্যাত কেএনএফ কর্তৃক ১১ জনকে হত্যা এবং একজনকে মারধরসহ ৪ জনকে অপহরণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ভাগ করো শাসন করো নীতির ভিত্তিতে জুম্মদের মধ্যে সংঘাত চাপিয়ে দেয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করা, সর্বোপরি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যর্থতা ধামাচাপা দিয়ে পার্বত্য পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার হীনউদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ কর্তৃক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন করে সন্ত্রাসী কাজে লেলিয়ে দেয়ার কার্যক্রমে সর্বশেষ সাম্প্রতিক সময়ে যোগ হয়েছে বমপার্টি নামে খ্যাত কুকি-চীন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার চালানো হয়ে থাকে, সাম্প্রতিক সময়ে আবির্ভাব হতে না হতেই এখন কেএনএফ সেই অপপ্রচার জোরেসোরে চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, কেএনএফ জামায়াতে আরাকান নামে একটি সশস্ত্র ইসলামী জঙ্গী সংগঠনকে রুমা উপজেলার রেমাক্রী প্রাংসা এলাকায় তাদের গোপন আস্তানায় আশ্রয় দিয়েছে। বিনিময়ে জামায়াতে আরাকানের পক্ষ থেকে কেএনএফকে অস্ত্র ক্রয়সহ মাসিক অর্থ সাহায্য প্রদান করা হয় বলে জানা গেছে।”