বান্দরবানে সেনাবাহিনী কর্তৃক মর্টারের গোলা উদ্ধারের দাবি সাজানো নাটক!

0
909
ছবিতে আলোচিত মর্টার শেল

হিল ভয়েস, ২৪ আগস্ট ২০২১, বান্দরবান: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে একের পর এক মর্টারের গোলা উদ্ধারের দাবিকে স্থানীয় একাধিক সূত্রে সেনাবাহিনীর সাজানো নাটক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্রসমূহের অভিযোগ, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ও জুম্ম জনগণের উপর পরিচালিত দমন-পীড়ন ও সেনাশাসনকে জায়েজ করার হীন উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী এসব নাটক প্রায়ই করে থাকে। তাদের দাবি, নিজেদের প্রমোশনের জন্যও সেনাবাহিনীর কম্যান্ডারেরা মাঝেমধ্যে এধরনের গোলাগুলি ও অস্ত্র উদ্ধার এবং নিরীহ গ্রামবাসীকে ধরে সন্ত্রাসী আটক করার নাটক করে থাকে।

উল্লেখ্য, গতকাল ২৩ আগস্ট ২০২১ আবারও সেনাবাহিনী কর্তৃক বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে ১২টি মর্টারের গোলা উদ্ধার করা হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে সেনাবাহিনী তিনবার বান্দরবান পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক মর্টারের গোলা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করলো।

কিন্তু স্থানীয় সূত্রগুলোর জোরালো দাবি, বান্দরবানে মর্টারের গোলা উদ্ধারের ঘটনা সেনাবাহিনীর সাজানো নাটক। বস্তুত সেনাবাহিনী প্রায় মাস দেড়েক আগে মিয়ানমারের একটি সশস্ত্র দলের কাছ থেকেই এই মর্টারের গোলাগুলো সংগ্রহ করেছিল।

গত ২৩ আগস্ট ২০২১ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “আজ সোমবার রাতে সেনাবাহিনীর রুমা জোন সদর দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গোয়েন্দা তথ্যে নিশ্চিত হয়ে উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে সাঙ্গু নদের তীরবর্তী বাছারদেও পাড়া এলাকার জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ে অভিযান চালানো হয়। এতে বাছারদেও পাড়ার আশপাশের বেশ কিছু সন্দেহজনক এলাকা ঘেরাও করে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়েছে। সেখানে অবস্থানরত সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি জানতে পেরে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে তল্লাশির সময় একটি পাহাড়ের ঢালে মাটির নিচে সন্ত্রাসীদের লুকিয়ে রাখা ১২টি মর্টারের গোলা পাওয়া যায়। …রুমা জোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ, মেজর মুহতাদী কামাল আহমদ ও ক্যাপ্টেন অনিন্দ্য ইমতিয়াজের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।”

অপরদিকে সেনামদদপুষ্ট অনলাইন গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিত ‘পাবত্যনিউজ.কম’-এ গত ১৮ আগস্ট ২০২১ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “বান্দরবানের থানচিতে মর্টার ও রকেট লাঞ্চারের গোলা উদ্ধার করেছে বিজিবি। মঙ্গলবার (১৭ আগস্ট) বান্দরবান রিজিয়নের আওতাধীন বলিপাড়া ৩৮ বিজিবি কর্তৃক এসব উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন বলিপাড়া জোনের জোন কম্যান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার মুহাম্মদ শরীফ-উল-আলম। স্থানীয় সোর্স ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযানে তিনটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মর্টার বম্ব এবং দুটি আরএল এর গোলা উদ্ধার করা হয়।”

এর পূর্বে গত ২০ জুলাই ২০২১ দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে, সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়ন সদর দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বান্দরবান সেনা রিজিয়নের অধীন বলীপাড়া বিজিবি জোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার মুহম্মদ শরীফ-উল-আলমের নেতৃত্বে সেনা ও বিজিবি সদস্যরা দুর্গম গালেংগ্যা এলাকা থেকে গত ১৯ জুলাই ২০২১ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ২৯টি মর্টার শেল উদ্ধার করে বলে দাবি করা হয়।

সেনাবাহিনীর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, “গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গালেংগ্যা এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে মাটির নিচে ২৯টি বিস্ফোরক মর্টারশেল পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। অভিযান পরিচালিত স্থানে আগে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর গোপন আস্তানা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতার কারণে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী টিকতে পারেনি। তারা বোমাগুলো মাটির নিচে লুকিয়ে রেখে পালিয়ে গেছে। বোমাগুলো উদ্ধার করা সম্ভব না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল। উদ্ধার হওয়ায় স্থানীয় লোকজন মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।”

এ প্রেক্ষিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একটি সূত্র দাবি করে যে, সেনা ও বিজিবি সদস্যদের কর্তৃক মর্টার শেল উদ্ধারের সংবাদটি একটি সাজানো নাটক। সূত্রটি জানায়, বস্তুত সেনাবাহিনী ঐদিন রুমার স্থানীয় বাসিন্দা ওয়েবার ত্রিপুরা নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারের এক সশস্ত্র দলের কাছ থেকে থানচি এলাকা থেকে ৯৯টি মর্টার শেল গ্রহণ করে। মিয়ানমারের এক সশস্ত্র দলের কাছ থেকে পাওয়া ঐ মর্টার শেলগুলোই উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি ও প্রচার করা হচ্ছে।

এদিকে, সেনাবাহিনী কর্তৃক সর্বশেষ ১২টি মর্টারের গোলা উদ্ধারের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, বান্দরবানের সেনাবাহিনী মর্টারের গোলা উদ্ধারের ঘটনা সম্পূর্ণ সাজানো নাটক। প্রমোশনের জন্য তারা এসব করছে। উদ্ধারের নাটকটি বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য সেনাবাহিনীর একটি দল বর্তমানে তথাকথিত গোলা উদ্ধারের জায়গায় বাংকার খনন করে সপ্তাহ বা দশদিনের খোরাকিসহ তল্পিতল্পা নিয়ে অবস্থান করছে।

জেএসএস এর কম্যান্ডার আটকের নামেও অপপ্রচার

অপরদিকে, গত ২২ আগস্ট ২০২১ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাধীন রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার জীবতলী এলাকা থেকে সেনাবাহিনী কর্তৃক অমল কান্তি চাকমা (৩৯) নামে এক গ্রামবাসীকে আটকের পরও মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙ্গামাটির এক অধিকার কর্মী বলেন, গত ২২ আগস্ট ২০২১ সেনামদদপুষ্ট অনলাইন পত্রিকা ‘পার্বত্যনিউজ.কম’-এ প্রকাশিত এক সংবাদে গ্রেফতারকৃত গ্রামবাসী অমল কান্তি চাকমাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যাভাবে ‘জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপ কম্যান্ডার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এই কাহিনীটি যে বানোয়াট তা বিভিন্ন খবরে স্পষ্ট হয়েছে। পার্বত্যনিউজ.কম-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, অমল কান্তি চাকমাকে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার জুরাছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত কুকিমারা এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। অপরদিকে, ২৩ আগস্ট ২০২১ পাহাড়বার্তা.কম-এ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটি উপজেলা সদরের জীবতলী ইউনিয়নের পানছড়ি পাড়া এলাকায় যৌথবাহিনী কর্তৃক অভিযান চালিয়ে অমল কান্তি চাকমাকে আটক করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, সেনামদদপুষ্ট ‘পার্বত্যনিউজ.কম’-এ প্রকাশিত এক সংবাদে ‘জেএসএস’এর শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে প্রচার করা হলেও পাহাড়বার্তা.কম-এ ‘জেএসএস’ এর কোনো নামই নেই।