মিডিয়ায় আদিবাসী সাংবাদিকদের সংখ্যা বাড়ানো জরুরী: গণমাধ্যম সংক্রান্ত আলোচনায় বক্তারা

0
402

হিল ভয়েস, ২৩ আগষ্ট ২০২২, ঢাকা: মূলধারার মিডিয়ায় আদিবাসী সাংবাদিকদের সংখ্যা বাড়ানো এবং সেই সাথে আইপিনিউজের মত আদিবাসীদের নিজস্ব গণমাধ্যম তৈরি করা দরকার বলে অভিমত দিয়েছেন গণমাধ্যম সংক্রান্ত আলোচনা সভার বক্তারা।

আজ মঙ্গলবার (২৩ আগস্ট) সকাল ১০.০০ টায় আইপিনিউজ-এর উদ্যোগে ”আদিবাসী সংবেদনশীল গণমাধ্যমঃ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা” শীর্ষক একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত আলোচনা সভাটি বাংলা মোটর এ অবস্থিত বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উক্ত আলোচনা সভায় আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, সাংবাদিক ও লেখক নজরুল কবির এবং লেখক ও গবেষক সারা মারান্ডী।

আইপিনিউজ এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য মেইনথিন প্রমীলা’র সঞ্চালনায় উক্ত আলোচনা সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ।

প্রথম আলো’র যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, রাষ্ট্রের বৈরী আচরণ হিসেবে নিজের আদিবাসী বন্ধুর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন “আমার সেই আদিবাসী বন্ধুটি অনেক বছর সচিব হিসেবে কাজ করেও সিনিয়র সচিব হতে পারেনি। এগুলো হচ্ছে রাষ্ট্রের বৈরী আচরণ। সংবিধানের পূণর্লিখিত হওয়া উচিত। প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার থাকতে হবে। এই কথা সংবিধানেও আছে। তবে রাষ্ট্র যে বৈষম্য করছে, এই কথা অস্বীকার করা যাবে না।

তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্র নির্ধারণ করলো “আদিবাসী” বলা যাবে না। এখন আমি আমার পরিচয় কিভাবে দিবো সেটা কি রাষ্ট্র ঠিক করে দিবে! বলেও প্রশ্ন রাখেন তিনি। গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দুটোই পরিবর্তন জরুরী।
কোটা আন্দোলনের সময় ছাত্রদের দাবী ছিলো কোটা কমিয়ে আনার জন্য। প্রধানমন্ত্রী কি করলো? সব কোটা বাতিল করে দিলো। আমরা এমন রাষ্ট্র চাই না। আমরা একটি মানবিক রাষ্ট্র চাই। যে মানুষেরা গণমাধ্যম চালায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পালটানোও জরুরী বলে মনে করেন এই সাংবাদিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী দেশ। বহুত্ববাদ হচ্ছে বাংলাদেশে বহু জাতি, বহু ধর্মের, বহু ভাষার মানুষ আছে। এই বহুত্ববাদকে আমরা সবসময় ভয় পাই। তিনি আরো বলেন, আমাদের সবার চেষ্টা করা উচিত অন্যকে সম্মান করা। আদিবাসী মানেই যে তীর ধনুক নিয়ে একজন, এমন না। তারা বুদ্ধিবিবেচনা সহ শিক্ষিত মানুষও।

তিনি আরো বলেন, কিভাবে আমরা গণমাধ্যমে আদিবাসীদের তথ্য আনতে পারি সে বিষয়টা এই রাষ্ট্রে বড়ই জটিল একটি সমীকরণ। তিনি মেইন স্ট্রিম মিডিয়ায় আদিবাসী সাংবাদিকদের সংখ্যা বাড়ানো তথা আইপিনিউজ এর মত আদিবাসীদের নিজস্ব গণমাধ্যম তৈরীরও কথা বলেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে লেখক ও গবেষক সারা মারান্দী বলেন “আদিবাসীদের ইস্যুটি আমরা সংবেদনের সাথে কিভাবে গণমাধ্যমে তুলে ধরতে পারি। তেভাগা আন্দোলনে আদিবাসী সহ, আপামর কৃষকেরাও ঝাপিয়েও পড়েছিলো। ভূমি শুধুমাত্র আদিবাসীদের আয়ের উৎস না, ভূমি তাদের অস্তিত্ব। চিটাগাং এর একটি ঘটনা আমরা জানি, একজন নারী প্রায় ৪০ বছর ধরে নিজের ভূমির জন্য লড়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন, আদিবাসী দিবসটি কিন্তু অনেক উৎসাহের সাথে পালিত হচ্ছে। যদিও আদিবাসী সম্বোধনে সরকার একটি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তবু এই আদিবাসীরা কিক্ত নিজেদের মত করে জানান দিয়েছে যে “আমরা আছি”। আদিবাসীরা এখন স্বতস্ফুর্ত ভাবে নিজেদের জাতিস্বত্বার পরিচয় দিতে গর্ববোধ করছে। এটা একটি অর্জন।

সাংবাদিক নজরুল কবির বলেন, “আজ থেকে ২০ বছর আগের যে গণমাধ্যম তার সাথে আজকের গণমাধ্যমের মধ্যে অনেক পার্থক্য। গণমাধ্যমের মালিকেরা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম এখন কর্পোরেট হয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমে লড়াই করে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামকে শুধুমাত্র একটি বিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছিলো।

তিনি আরো বলেন, আমি পত্রিকায় টানা ২৯দিন আদিবাসীদের নিয়ে সিরিজ রিপোর্ট করেছি। আমার কাছে তখন মনে হয়েছে কি হচ্ছে এই সিরিজ রিপোর্ট করে? তখন আমি আন্দোলনে ঝাপিয়ে পরি।

আদিবাসীদের লড়াই কঠিন থেকে আরো কঠিনতর হচ্ছে দাবী করে এই সাংবাদিক আরো বলেন, যে মানুষকে আমি আদিবাসী দিবসে দেখেছি, বিভিন্ন ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছে কয়দিন পর তাকে আমি আর দেখতে পাচ্ছি না। কারণ তার তখন ভোটের দরকার ছিলো।

পাভেল পার্থ আলোচনা সভায় শুধুমাত্র আদিবাসী সংক্রান্ত নয় বরং চা শ্রমিকদের বঞ্চনার ঘটনা তুলে ধরেন। দেশে যখন লকডাউন চলে তখনো চা বাগানের শ্রমিকদের সংগঠন চিঠি পাঠিয়ে ছুটির দাবী জানায়। এরই মধ্যে চা শ্রমিকদের মধ্যে দ্বৈত ভীতি ছিলো। একটি করোনা সংক্রমণের আরেকটি মজুরি না পাওয়ার।

এদিকে সরকারের “আদিবাসী” সম্বোধনে নিষেধাজ্ঞায় দেখা যায় মানুষের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া আছে। “আদিবাসী এবং আদি বাসিন্দা দুটো সম্বোধন আলাদা আলাদা অর্থ ব্যক্ত করে। এটা এক ধরণের শ্রেণীগত সাংস্কৃতিক বৈষম্য। দেখা যায়, পাহাড়ের প্রতি সংবেদনশীলতা না রেখে বরং ম্যারিয়ট হোটেলের বিজ্ঞাপনই সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হতো।
তিনি আরো বলেন, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে দাঁড়িয়ে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাও বলেছিলেন- আমরা বাঙালি নই। আমরা অনেকে চাকমা, মারমা, সংবিধানে সকল জাতিসত্তার পরিচয় নাই।

শতাধিক অংশগ্রহনকারীর উপস্থিতিতে আয়োজিত উক্ত আলোচনা সভার এক পর্যায়ে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন মাদল এর সদস্য শ্যাম সাগর মানকিন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হরেন্দ্র নাথ সিং প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here