জুরাছড়িতে পিসিপির কাউন্সিল অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর বাধা, আটক, মারধর, পিসিপি ও এইচডাব্লিউএফের নিন্দা ও সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি

হিল ভয়েস, ৩ এপ্রিল ২০২৫, রাঙ্গামাটি: আজ বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল ২০২৫) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার জুরাছড়ি উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), জুরাছড়ি থানা শাখার পূর্বনির্ধারিত ২২তম বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক বাধা প্রদান করে অনুষ্ঠান পন্ড করে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদারসহ সফর টিমকে ভিজা কিচিং আর্মি ক্যাম্পে আটকে রেখে সম্মেলনে যোগদান করতে বাধা প্রদান ও হয়রানি করা হয় এবং পিসিপির জুরাছড়ি থানা শাখার ৪ নেতাকর্মীকে আটক ও অন্তত ৬ গ্রামবাসীকে মারধর করা হয়। এছাড়া এলাকায় সেনাবাহিনী কর্তৃক ব্যাপক চেকপোস্ট বসিয়ে ছাত্র-জনতাকে অনুষ্ঠানস্থলে আসতে বাধা প্রদান করা হয়।

পিসিপির এই গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে সেনাবাহিনী কর্তৃক এভাবে বাধাগ্রস্ত করার ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটি একটি যৌথ প্রেস বিবৃতির মাধ্যমে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিবৃতিতে সেনাবাহিনীর বাধায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সম্মেলন পণ্ড বলে অভিযোগ করে ‘অপারেশন উত্তরণসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার পূর্বক অতিদ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন।

ছবি : পিসিপি ও এইচডাব্লিউএফের যৌথ বিবৃতি

পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক অন্বেষ চাকমা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বার্তায় উল্লেখ করা হয়, “পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, জুরাছড়ি থানা শাখার ২২তম বার্ষিক সম্মেলন ও কাউন্সিল পূর্ব নির্ধারিত ছিল। জুরাছড়ি সদরে জেলা পরিষদ বিশ্রামাগারের মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পাদন করা ও সহযোগিতা পাওয়ার লক্ষ্যে পিসিপির পক্ষ থেকে গত ২৮ মার্চ’২৫ তারিখে জুরাছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর অবগতি পত্র প্রদান করা হয়। পিসিপির প্রতিনিধি টিমকে ইউএনও অফিস থেকে সম্মেলন আয়োজনের অনুমতি দেয়া যাবে না বলে জানানো হয়। সম্মেলনকে বাধাগ্রস্ত করতে গতকাল থেকেই জুরাছড়ি যক্ষ্মা বাজার আর্মিক্যাম্প থেকে জুরাছড়ি সদরে সেনাবাহিনীর টহল অভিযান জোরদার ও জুরাছড়ি সদরে প্রবেশ মুখে অন্তত: ৭টি স্থানে অস্থায়ী তল্লাশি চৌকি বসানো হয়। তল্লাশি চৌকিসমূহ হলো:- ১. রাস্তা মাথা, ৩নং ওয়ার্ড, ২নং বনযোগীছড়া ইউনিয়ন; ২. বরইতুলি, ৩নং ওয়ার্ড, বনযোগীছড়া ইউনিয়ন; ৩. ধামাই পাড়া, ২নং ওয়ার্ড, বনযোগীছড়া ইউনিয়ন; ৪. জুরাছড়ি সদর লঞ্চঘাট; ৫. আনন্দ পাড়া, ২নং ওয়ার্ড, ২নং বনযোগী ছড়া ইউনিয়ন; ৬. জুরাছড়ি থানার সামনে এবং ৭. লুলাংছড়ি, ৭নং ওয়ার্ড, ১নং জুরাছড়ি ইউনিয়ন। এসব তল্লাশি চৌকিতে গতকাল থেকেই সাধারণ জনগণকে নাম জিজ্ঞেস করা, জাতীয় পরিচয় পত্র চেক করা, বাজার ব্যাগ চেক করাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, গতকাল ২নং বনযোগীছড়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের আনন্দ পাড়ায় তল্লাশি চালানোর সময় ৬ জন গ্রামবাসীকে হয়রানি ও মারধর করেছে সেনাসদস্যরা। মারধরের শিকার হওয়া ছয় গ্রামবাসী হলেন- (১) নাম- রন্তু চাকমা (২৫) পিতা-বুদ্ধ চাকমা, (২) নাম- অমর বিকাশ চাকমা (২৮) পিতা-সাগর চাকমা, (৩) নাম- সঞ্জীব চাকমা (৩০) পিতা-কালামরত চাকমা, (৪) নাম- মেন্ত চাকমা (৩০), পিতা- রাবনা চাকমা (৫) নাম- নান্টু চাকমা (৩২) পিতা-রাবনা চাকমা, (৬) নাম- চিকন্ন্যে চাকমা (৪২) পিতা- অনুদাশ চাকমা।

আজ সম্মেলনের দিনে সকালে অনুষ্ঠানের জুরাছড়ি সদর ও পূর্বনির্ধারিত স্থান জেলা পরিষদ বিশ্রামাগারের মিলনায়তনের চারদিকে সেনাবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। এসময় সেনাসদস্যরা মিলনায়তনটি সিলগালা করে দেয় এবং হল রুমের বারান্দায় পিসিপির ৪ জন কর্মী ও সমর্থককে আটকে রাখে। উক্ত ৪ জন হলেন- (১) স্বরেশ চাকমা, সহ-সভাপতি, পিসিপি জুরাছড়ি থানা শাখা, (২) মনিষ চাকমা, সহ-সভাপতি, পিসিপি জুরাছড়ি থানা শাখা, (৩) ইমন চাকমা, স্কুল ও পাঠাগার সম্পাদক, পিসিপি, জুরাছড়ি থানা শাখা এবং (৪) লিটন চাকমা, সাধারণ স্কুল ছাত্র।”

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, “এইদিকে আজ ৩ এপ্রিল ২০২৫ খ্রি: সকালে সম্মেলন ও কাউন্সিলের প্রধান অতিথি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য শ্রী ঊষাতন তালুকদারসহ একটি সফর টিম রাঙ্গামাটি সদর থেকে বোটযোগে রওনা হলে পথিমধ্যে ভিজা কিচিং সেনাক্যাম্প চেকপোস্টে আটকানো হয় এবং সফর টিমের উপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলার আশংকার অজুহাতে জুরাছড়িতে না যাওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়। সফর টিমের পক্ষ থেকে এরকম হামলার কোনো সম্ভাবনা নেই বলা হলেও সেনাবাহিনীর সদস্যরা জুরাছড়িতে যেতে বাধা দেয় এবং প্রায় ৪০ মিনিটের অধিক সময়ের পরও সেনাবাহিনীর অবস্থানের কোনো পরিবর্তনের না হলে সফর টিম রাঙ্গামাটিতে ফেরত যায়।”

বিবৃতিতে বলা হয়, “পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ একটি গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পিসিপি তার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। পিসিপি কোনো নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী সংগঠন নয়। কিন্তু তারপরেও জুরাছড়িতে পিসিপি’র নেতাকর্মীদের ওপর বিভিন্ন সময়ে মামলা ও ধরপাকড়সহ নানা নিপীড়ন ও নির্যাতন অব্যাহত রাখা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের মিটিং, মিছিল, সমাবেশ ও কাউন্সিল করার গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোকে ভূলন্ঠিত করা হচ্ছে, যা একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কখনও কাম্য নয়।

রাঙ্গামাটির জুরাছড়িতে সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনের এমন অগণতান্ত্রিক, অপেশাদারি ও অসহযোগিতামূলক ভূমিকা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা ও নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক হামলা, মামলা, ধরপাকড় সংঘটিত করে পার্টির হাজারো নেতাকর্মীকে ঘরবাড়ি ছাড়া করা হয়েছে; যা বর্তমানে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ও চলামান রয়েছে। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখনও পর্যন্ত একটি টর্চার সেলের মতো রাখা হয়েছে।

পিসিপির মতো একটি গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমে বাধা প্রদান করা পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা গোটা দেশের জন্য কখনোই শুভ হতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে লঙ্ঘন করে ২০০১ সাল থেকে অপারেশন উত্তরণের নামে চলমান সেনাশাসন পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁিড়য়েছে। তাই অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহারসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার পূর্বক অতিদ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকট পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন জোর দাবি জানাচ্ছে।”

সর্বশেষ বিকাল ২:৩০ টার দিকে আটককৃত পিসিপির নেতাকর্মীদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

More From Author