চবিতে পিসিপি’র উদ্যোগে নবীন বরণ ও বিদায় সংবর্ধনা ২০২৫ অনুষ্ঠিত

হিল ভয়েস, ২৭ফেব্রুয়ারি ২০২৫, চবি: আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রোজ বৃহস্পতিবার “জ্ঞান আহরণে বিশ্ব বিদ্যাপীঠে এসো নবীন প্রাণ, অস্তিত্ব রক্ষায়, শেকড়ের টানে চেতনায় দিই শাণ” স্লোগানকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে “নবীন বরণ ও বিদায় সংবর্ধনা ২০২৫” আয়োজন করা হয়।

উক্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষ ও ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের নবীন আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বরণ এবং ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষ ও ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আজ দুপুর ৩ ঘটিকায় বিশ্ববিদ্যালয়স্থ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়।

উক্ত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন । এছাড়াও সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুমেন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক উলিসিং মারমা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, চবি সংসদের সভাপতি সুদীপ্ত চাকমা, ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরাম, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি পাভেল ত্রিপুরা, বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শৈমং সাইন মারমা প্রমুখ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সুমন চাকমা ও সহ-সাধারণ সম্পাদক সুখী কুমার তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি অন্বেষ চাকমা। আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এনতেস চাকমা। অনুষ্ঠানের শুরুতে উত্তরীয় পরিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেয়া হয়।

অনুষ্ঠানে নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বরণমাল্য পাঠ করেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী তিথি তির্কী এবং বিদায়ী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রীতি স্মারক পাঠ করেন পালি বিভাগের শিক্ষার্থী ঐতিহ্য দেওয়ান। বিদায়ী শিক্ষার্থীদের মানপত্র, ফুল ও বিদায়ী স্মারক প্রদান করেন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা। নবীন শিক্ষার্থীদের বরণমাল্য, ফুল ও স্মারক দিয়ে বরণ করেন পিসিপি’র সাধারণ সম্পাদক রুমেন চাকমা। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও মেধাবী খেলোয়াড় প্রেন চ্যুং ম্রোকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা।

এছাড়াও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের পক্ষে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্রিয়াংকা পিংকি দারিং, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বর্ষ বরণ কুবি। এছাড়াও ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন নুখাই মং মারমা, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন পহেলা চাকমা।

প্রধান অতিথি বক্তব্যে উপ উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য জ্ঞানের এক অমূল্য ক্ষেত্র। পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে নিতে হবে। আধুনিক বিশ্বের আধুনিক নাগরিক হয়ে উঠতে হবে তবেই সমাজ,দেশ ও জাতি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

অধ্যাপক ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা বলেন, “নিজেকে জানার জন্য, নিজেকে গঠন করার জন্য যে যেখানেই থাকিনা কেন আমাদের জ্ঞান প্রত্যাশী হতে হবে। সেই জ্ঞান আমাদের অস্তিত্ব ও শেকড়ের সাথে যোগসূত্র হবে। আমাদের শেকড় হচ্ছে পাহাড়। নবীনরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই নিজেকে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে নেতৃত্বগুণ এবং বিশ্বজগতের জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা ও দক্ষতা অর্জন করার সুযোগ পায়। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে নবীনদের এগিয়ে যেতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বায়নের যুগে ছাত্র সমাজকে অধিকতর যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি ও সত্তাকে সমুন্নত রেখে গড়ে উঠতে হবে।”

ছাত্রনেতা রুমেন চাকমা বলেন, “গতবছর আগস্ট অভ্যূত্থানের পর দেশে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ন্যায় অভ্যূত্থান পরবর্তী দেশের নেতৃত্বও আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে উদাসীন। আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে আজকে আমাদের সবার মধ্যে বোঝাপড়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ তরুণ ছাত্র সমাজকেই হতে হবে আগামী দিনের লড়াইয়ের কারিগর।”

তিনি আরও বলেন, “আজকে দেশে-বিদেশে মৌলবাদী গোষ্ঠী আমাদের বিষয়ে অপপ্রচারে মত্ত। তার বিপরীতে এই ছাত্র সমাজকেই সেসব কিছুর মোকাবিলা করে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দানে যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। আধুনিক বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে হলে অধ্যয়ন ও দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। তাই জুম্ম জনগণের অধিকার সনদ হিসেবে পার্বত্য চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি-১৯০০ সহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে পড়াশোনা জারি রাখতে হবে।

এছাড়াও তিনি বলেন, “শাসকগোষ্ঠী আজকে জুম্ম জনগণের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করেছে। এই বিভাজন কাটিয়ে উঠে আন্দোলনের এক কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। শাসকগোষ্ঠী আমাদের মধ্যকার জাতিগত বিভাজন সৃষ্টি করতেও তৎপর। আমাদের সকলকে মিলেমিশে আর দৃঢ়তর ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই জাতিগত বিভাজনও রুখে দিতে হবে।

উলিসিং মারমা বলেন, “একজন ব্যক্তিকে প্রকৃত জ্ঞানী হতে হলে অবশ্যই সমাজ, জাতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সম্যকভাবে মনে ধারণ করতে হবে, লালন করতে হবে। আজকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অমূল্য জ্ঞানের সীমানায় এসে ছাত্র সমাজকে অস্তিত্বের চেতনা ও শেকড়কে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে।”

সুদীপ্ত চাকমা বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংখ্যাগুরুর উগ্র জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনের ফলে আজকে প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। দুঃখজনক হলে সত্য যে আজকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিত সমাজও শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। যা সামগ্রিকভাবে কখনোই মঙ্গলদায়ক নয়। সমাজ তথা জাতির অগ্রগামী অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জাতিগঠনে আরও অধিকতরভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।”

পাভেল ত্রিপুরা বলেন, “বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আমাদের নিজেদের এমন করে গড়ে তুলতে হবে যাতে আমাদের অর্জিত জ্ঞান সমাজের ও দেশের অগ্রগতিতে অবদান রাখতে উপযোগী হবে। আমাদের বাধাঁ অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে মানসিকতা থাকতে হবে। তবেই সমাজ পরিবর্তনের কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণ হবে।”

শৈমং সাইন মারমা বলেন, “আজকে নবীনরা সংকুচিত গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাহীন জ্ঞান সাগরে পা দিয়েছেন। নবীন বন্ধুদের এই জ্ঞান সাগরে জ্ঞান আহরণ করে ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও জাতি গঠনে কাজে লাগাতে হবে। সমাজ পরিবর্তনের গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এই ছাত্র সমাজকেই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মানসিকতা নিয়ে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে।”

সভাপতি বক্তব্যে অন্বেষ চাকমা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা সমাজের অগ্রণী অংশ। কাজেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জনজীবনের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা নিয়ে তা শেকড়ের জন্য উজাড় করে দিতে হবে।”

সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব নবীন বরণ ও বিদায় সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা সমাপ্ত হয়। দ্বিতীয় পর্বে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক সংগঠন রঁদেভূ শিল্পীগোষ্ঠী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীবৃন্দ।

More From Author