রোডম্যাপ ঘোষণাপূর্বক পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের দাবিতে চবিতে পিসিপি’র মানববন্ধন ও সমাবেশ

0
332

হিল ভয়েস, ২৮ নভেম্বর ২০২২, চট্টগ্রাম: আজ ২৮ নভেম্বর ২০২২ সকাল ১০:০০ টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর উপলক্ষে দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণাপূর্বক পার্বত্য চুক্তির যথাযথ ও দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখার উদ্যোগে একটি মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক রুমেন চাকমা, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, চবি শাখার আহ্বায়ক রাজেশ্বর দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, চবি সংসদের সভাপতি প্রত্যয় নাফাক, পিসিপি’র চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হ্লামিও মারমা, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরামের চবি অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক সুখীজয় তঞ্চঙ্গ্যা, পিসিপি’র চবি শাখার সদস্য সুখীকুমার তঞ্চঙ্গ্যা। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পিসিপি’র চবি শাখার সাধারণ সম্পাদক নরেশ চাকমা এবং সঞ্চালনা করেন সাংগঠনিক সম্পাদক অন্তর চাকমা।

সমাবেশে সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনদফা দাবিনামাসহ বিবৃতি পাঠ করেন সদস্য আলফ্রেড চাকমা এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন সদস্য সুভাষ চাকমা।

স্বাগত বক্তব্যে পিসিপি’র চবি শাখার সদস্য সুভাষ চাকমা বলেন, যে পার্বত্য চুক্তিকে জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার সনদ হিসেবে আমরা জানি সেই চুক্তির আজ ২৫ বছর অতিক্রান্তের পরও বাস্তবায়নের বেলায় সরকারের অনীহা আমাদের হতাশ করে। চুক্তি অনুযায়ী সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও দুঃখজনকভাবে ২০০১ সাল থেকে পাহাড়ে ‘অপারেশন উত্তরণ’ নামে সেনাশাসন আরো জোরদার করা হয়েছে। এই চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের যেরকম পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে তার সঙ্গে ব্যাপক ফারাক দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও তিনি চুক্তি যথাযথ ও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

পিসিপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক রুমেন চাকমা তার বক্তব্যে বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে জুম্ম জনগণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ঠিক একইভাবে চুক্তির ২৫ বছর পরেও জুম্ম জনগণের শাসনতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তিনি আরো বলেন, চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চল রাখার কথা থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম সেটেলার অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর বিশেষ মহল কুকি-চিন সন্ত্রাসীসহ নানা চুক্তি বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী সৃষ্টি করে চুক্তি বিরোধী কার্যক্রম করছে। এছাড়াও উন্নয়নের নামে ভূমি-উচ্ছেদ করা হচ্ছে, যার ফলে বিশাল সংখ্যক জুম্ম আদিবাসী নিজ বাস্তুভিটা ছেড়ে দেশান্তরি হতে বাধ্য হচ্ছে। জুম্ম জনগণের লড়াই সংগ্রামকে ভূলুন্ঠিত করার জন্য সেখানে প্রতিনিয়ত শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র চলছে। চুক্তি বাস্তবায়নে তিনি ছাত্র সমাজকে চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানান।

পিসিপি’র চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা তার বক্তব্যে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা ভূমি সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের যথাযথ কোন পদক্ষেপ আমরা আজও দেখতে পাই না। পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ নারীদের নিরাপত্তা নেই, ভূমির অধিকার নেই।

গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, চবি’র আহ্বায়ক রাজেশ্বর দাশগুপ্ত বলেন, এদেশে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না, তার উদাহরণ আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে দেখতে পাই। সেখানে আদিবাসীদের মৌলিক অধিকারকে প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। মাতৃভাষায় শিক্ষাদান দেখা যায় না। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে এত দীর্ঘসময় লাগার কথা নয়। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পর্যটনের নামে আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে চিম্বুক পাহাড়ে হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে সে কথা আমরা জানি। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, সরকারের এইসব কর্মকাণ্ড চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে যায় কিনা। এছাড়াও তিনি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, চবি সংসদের সভাপতি প্রত্যয় নাফাক বলেন, বাংলাদেশে নিপীড়িত আদিবাসীদের আরো নিপীড়ন করা হচ্ছে। তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় রক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ দেখা যায় না। আদিবাসীদের ভূমি বিভিন্ন উন্নয়নের নামে কেড়ে নেয়া হচ্ছে। সিলেটে খাসিয়া পুঞ্জিতে জমি দখল করা হচ্ছে। মধুপুরে গারোদের ভূমি বনবিভাগ কেড়ে নিচ্ছে। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যখন আমাদের কথা বলার জন্য মুখের ভাষা লুটে নেয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সংকটকে জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরী।

পিসিপি’র চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হ্লামিও মারমা তার বক্তব্যে বলেন, চুক্তির ২৫ বছর পরেও আমরা শান্তির সুবাতাস পাইনি। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা যদি সামরিক কায়দায় সমাধান চান তবে এই ছাত্রসমাজ বসে থাকবে না।

বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরামের চবি অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক সুখীজয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, সরকার অন্ধ নয় যে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আমাদের হাহাকার দেখে না, আমাদের দাবির কথা জানে না। পার্বত্য চুক্তির অন্যতম ধারা হচ্ছে ভূমি সমস্যা নিরসন করা। কিন্তু আমরা এখানে যথাযথ পদক্ষেপ দেখছি না। আমরা শান্তিতে অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই। সরকার যেন অতি দ্রুত জুম্ম জনগণের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন করে।

পিসিপি’র চবি শাখার সদস্য সুখী কুমার তঞ্চঙ্গ্যা তার বক্তব্যে বলেন, আজকে বাংলাদেশে আনাচে-কানাচে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। এই জোয়ার আদৌ আদিবাসীদের কাছে গেছে কিনা জানা নেই। তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক ভূমি কমিশন তার কার্যক্রমের উদ্যোগ নিলে সেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সেটেলার বাঙালিরা নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সৌন্দর্য হচ্ছে, বহুজাতিক সহাবস্থান থাকবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমূহ নানা আগ্রাসনের মুখে পড়ে অস্তিত্বের সংকটে আছে।।

সভাপতির বক্তব্যে পিসিপি’র চবি শাখার সাধারণ সম্পাদক বলেন, বছর ঘুরলেই আমাদের পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে। আজ চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫ বছর পরেও আমরা ধৈর্য ও সরকারের উপর বিশ্বাস রেখে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে এসেছি। কিন্তু সরকারের অনীহা ও অনিচ্ছা আমাদের দিনদিন কঠোর আন্দোলনের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য করছে। তিনি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ঐক্যবদ্ধ অধিকতর আন্দোলনে ছাত্র সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

উক্ত মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তব্য শেষে শহীদ মিনার থেকে প্রশাসনিক হয়ে আবার শহীদ মিনার পর্যন্ত একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে পিসিপি’র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কর্তৃক সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবি জানানো হয়ঃ
১। দ্রুত রোডম্যাপ ঘোষণাপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে।
২। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন কার্যকর করতে হবে।
৩। ছয়টি ক্যান্টনমেন্ট বাদে সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প ও অপারেশন উত্তরণ প্রত্যাহার করতে হবে।