পার্বত্য চুক্তির রজতজয়ন্তী: উগ্র জাতীয়তাবাদী ভ্রান্ত পথে হাঁটছে সরকার

0
387

বাচ্চু চাকমা

নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শোষণ-বঞ্চনা হতে মুক্তি লাভ করে। বাংলার মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে ঠিক, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠী আরেক ঔপনিবেশিক শক্তি বাংলাদেশ শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, নিপীড়নের কবলে পড়ে। এটাই সত্যিকার অর্থে জুম্ম জনগণের জন্য নির্মম বাস্তবতা ও ট্রাজেডি! এখনও পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শোষণের বশংবদ কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শাসকগোষ্ঠীর ভ্রান্ত জাত্যভিমানী নীতির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অগণিত বাপ-ভাইয়ের রক্ত ঝরেছে এবং শত-শত বীর শহীদদের রক্তদানের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে কালক্রমে ইতিহাস রচিত হয়েছে। পার্বত্য চুক্তির পর দীর্ঘ ২৫ বছরেও পাহাড়ের সমস্যার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান হয়নি।

বাংলাদেশ শাসকগোষ্ঠী যত বড় নির্দয়-নির্মম সেনাশাসন চাপিয়ে দিক না কেন তারপরও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখনির শক্তি, কথা বলার বাক স্বাধীনতা, লড়াই করার শক্তি ও সাহস যেন কখনো হারিয়ে না ফেলি। বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার প্রসিদ্ধ উক্তি, “যে জাতি সংগ্রাম করতে জানে না, সে জাতির পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার থাকতে পারে না”। মোঘল আমল, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে অধুনা বাংলাদেশ শাসনামলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধিবাসীদের লড়াই করে বেঁচে থাকার বাস্তবতা তৈরি করতে হচ্ছে। জুম্ম জাতি লড়াই করতে শিখেছে, জুম্ম জাতি রক্ত দিতে শিখেছে ও জুম্ম জাতি আত্মবলিদান দিতে এখনও ক্লান্ত হয়নি। কাজেই, জুম্ম জাতির ভাগ্য বিনির্মাণের জন্য শত-শত বীর শহীদদের রক্ত ও আত্মোৎসর্গের গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। শত-শত জুম্ম জাতির বীর সেনানীরা নিজের জীবন উৎসর্গ করে জুম্ম জাতির মুক্তির সংগ্রামের ময়দানে নিজেই একটি ইতিহাস হয়ে রয়েছে। শত-শত বীর শহীদদের আত্মবলিদানের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

বাংলাদেশ শাসকগোষ্ঠী আজও জুম্ম জনগণের দুঃখগুলো হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেনি। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী যেমনি পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালি জনগোষ্ঠীর দুঃখগুলো বুঝবার চেষ্টা করেনি, তেমনিভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীও পার্বত্য চট্টগ্রামের শোষিত, বঞ্চিত জুম্ম জনগোষ্ঠীর মানুষের দুঃখ ও মনের বেদনাগুলো বুঝবার চেষ্টা করেনি। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের কবলে পড়ে আমাদের বাপ-দাদার চৌদ্দ-গোষ্ঠীর মহা মূল্যবান সম্পদ ৫৪ হাজার একর ধান্যজমি ও স্থায়ী বসতভিটা হারিয়ে গেছে কাপ্তাই হ্রদের অথৈ জলরাশিতে। সেই সঙ্গে স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে যায় প্রায় এক লক্ষের অধিক জুম্ম জনগোষ্ঠীর পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, অনেক বর্ধিষ্ণু গ্রাম এবং বয়োবৃদ্ধ দাদা-দাদীর শৈশব ও কৈশোরের রঙিন দিনগুলোর কথা। এসব স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া অতীতের দিনগুলো ফিরে পাবার স্বপ্ন আমাদের মধ্যে এখনও ফিকে হয়ে যায়নি।

৬০ দশকের কাপ্তাই বাঁধ এক প্রবল ভূমিকম্পের মতোই করালগ্রাসে বিলুপ্ত করে দিয়েছে জুম্ম জনগণের একটা সভ্যতা, একটা সংস্কৃতি ও একটা জনপদ এবং তছনছ করে দিয়েছে লাখ লাখ জুম্ম জনগণের জাতীয় জীবনধারা। সেই সময় কাপ্তাই পানির কর্ণফুলীর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে জুম্ম সমাজের একটি বিশাল অংশসহ শত-শত ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, তেমনি বর্তমান সময়েও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় শতভাগ হুমকির মুখে রয়েছে পাহাড়ের নিপীড়িত জুম্ম জনগণ। সরকারের ষড়যন্ত্রের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জাতিসমূহের জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার পথে। শাসকগোষ্ঠীর এই হীন নীতি যদি বদলানোর চেষ্টা না করে তাহলে এক সময় পাহাড়ের জুম্ম জনগণ অন্য রাস্তা খুঁজে নিতে বাধ্য হবে।

পাহাড়ের জন্মভূমির অস্তিত্ব বিপন্ন হলে পাহাড়ি মানুষের জাতীয় জীবনধারা কী করে বেঁচে থাকবে? বেঁচে থাকার মতো কোন বাস্তবতা নেই বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জাতিসমূহের মধ্যে আজ শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ক্ষোভ, ঘৃণা ও তুষের আগুন জ্বলছে। জুম্ম জাতির ভবিষ্যৎ ভয়াবহ আশঙ্কায় ঘেরা জানার পরেও বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রেখে পাহাড়ের জুম্ম জনগণ আশা-ভরসায় বুক বেঁধে রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে পাহাড়-পর্বতের চূড়ায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আমাদের পাহাড়ের কচিকাঁচা ছেলেমেয়েরা এখনও বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি বলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সযত্নে রক্ষা করে চলেছে। দেশপ্রেমের চেতনাকে সবার উর্ধ্বে তুলে ধরে বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় এখনও পড়ালেখা করে শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। এতোকিছু করার পর জুম্ম জনগণের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর অনমনীয়তা, সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার অভাব বরাবরই চোখে পড়ছে।

জুম্ম জনগণের উপর বঞ্চনা ও অপমানের জ্বালা ও যন্ত্রণা দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। জুম্ম জনগণের ত্যাগ ও রক্তে গড়া ফসল লুটপাট করে খেয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে একশ্রেণির চরম সুবিধাবাদী ও জুম্ম জাতির কুলাঙ্গার। এসব বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক ও প্রতারকদের ওপর জুম্ম জনগণের ভরসা করার কোনো উপায় নেই। অথচ এই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের অস্তিত্বের একমাত্র অবলম্বন। জুম্ম জনগণের সামগ্রিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র ভিত্তিভূমি। আমাদের চোখের সামনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি লঙ্ঘিত হচ্ছে, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ডিপ-ফ্রিজের মধ্যে চুক্তিকে ঢুকিয়ে রেখেছে। শাসকগোষ্ঠীর এটা চরম অন্যায় ও জুম্ম জনগণের প্রতি দুরভিসন্ধিমূলক আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। সরকারের এসকল অন্যায়, অবিচার ও জঘন্য ষড়যন্ত্র চোখের সামনে ঘটে যাওয়ার পর আমাদের দেশপ্রেম ও জাতিপ্রেম কী দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে?

চোখ বন্ধ করে থাকলেই আমাদের জুম্ম জাতীয় জীবনধারা, জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব বাঁচবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরো নতুন করে আগুন জ্বলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে পাহাড়ের জুম্ম জনগণের জীবন-মরণ এবং বেঁচে থাকার আন্দোলন জোরদার হতে বাধ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুঃখগুলো গভীরে গিয়ে বুঝবার মতো চেতনাসম্পন্ন একদল সংঘবদ্ধ অগ্রগামী জুম্ম ছাত্র সমাজের উপস্থিতি আজও প্রয়োজন এবং বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার প্রদর্শিত আদর্শে সজ্জিত হয়ে নিঃস্বার্থ ও ত্যাগী এক একটি লৌহ মানবের উপস্থিতি জুম্ম জাতির সামনে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

শাসকগোষ্ঠীর জঘন্য নীতির লৌহ যবনিকা ভেদ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাধ্য করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশে ও বিদেশে আমাদের জুম্ম জাতির মুক্তির সনদ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ন্যায্য দাবিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিপ্লবী এম এন লারমা ও বর্তমান নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে বিগত দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের সর্বস্তরের মাঝে এক বিস্ময়কর জাগরণ এখনও জীবন্ত রয়েছে। লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় পাহাড়ের সমস্যাটি রাজনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য এক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করতে সরকার বাধ্য হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ২৫ বছরেও চুক্তির সুফল পাহাড়ের নিপীড়িত জুম্ম জনগণের কাছে পৌঁছেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়ন করাকে কেন্দ্র করে শাসকগোষ্ঠীর নানাবিধ টালবাহানা ও জঘন্য ষড়যন্ত্র প্রতিনিয়তই লক্ষ্য করে চলেছি। আমাদের সাথে সরকার যে মরণ-খেলা শুরু করেছে, তার আগুনে পুড়ে সরকারই একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়বে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে যুগের পর যুগ ধরে। বাংলাদেশ শাসকগোষ্ঠী যে জুম্ম জনগোষ্ঠীকে কারাগারে কয়েদি বানিয়ে রেখেছে, তাদের লড়াইটা আসলে এই শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের ন্যায়ের মধ্যেকার লড়াই। ফলশ্রুতিতে শাসকগোষ্ঠী তার প্রভূত্ব ধরে রাখতে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআইকে দিয়ে জুম্ম জনগণের মধ্যেকার বিভাজনের রাজনীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে তা আমাদের জুম্ম জনগণের উপর প্রয়োগ করে চলেছে। আসলে পাহাড়ের বুকে এই বিভাজনের রাজনীতি দীর্ঘদিনের এবং “ভাগ কর-শাসন কর”-এই বিভাজনের জঘন্য নীতির ভিত্তিতে জুম্ম জনগণের আন্দোলনের মূলশক্তিকে দূর্বল করে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার একটা হীনচক্রান্ত ছাড়া অন্য কিছু নয়।

পাহাড়ের মানুষের ভিতর থেকে বিভাজনের শিকড় উপড়াতে গেলে যে মানসিকতার প্রয়োজন, তা বর্তমান সময়ে এসেও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর মধ্যে খুব একটা দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। যার কারণে আমাদের জুম্ম জাতীয় জীবনে বিভাজনের এই সংস্কৃতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে এবং মানুষের চেতনাকে করেছে দুর্বল। এসকল নির্মম বাস্তবতা থেকে জুম্ম জনগণের সবচেয়ে অগ্রগামী অংশকে তুলে আনতে না পারলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন ইস্পাত-দৃঢ় হতে পারে না। অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করতে হীন নীতি ছলে-বলে-কৌশলে বাস্তবায়ন করতে মরিয়া শাসকগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে দূরে ঠেলে দেওয়ার নীতি প্রয়োগ করে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে। পাকিস্তানের জামানায় শুরু হওয়া এই ঘৃণ্য ও বর্বর নীতি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই অনুসরণ ও অনুকরণ করে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যাকে রাজনৈতিক উপায়ে সমাধানের চেষ্টা না করে বরঞ্চ উন্নয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং তথা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সমাধানের ব্যর্থ প্রয়াস আজও অব্যাহত রয়েছে।

সবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই সত্যকে অনুধাবন করতে বার বার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। যার কারণে পাহাড়ের সমস্যাকে তারা কখনো অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে কিংবা কখনো সামরিক উপায়ে সমাধানের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ১৯৭৬ সালে উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে এবং ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের সমতল অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ অসহায় বহিরাগত সেটেলার বাঙালিকে এনে পাহাড়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসন করেছে। ফলশ্রুতিতে পাহাড়ের জনমিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বসতিপ্রদানকারী বহিরাগতদেরকে জুম্ম জনগণের বিপরীতে রাষ্ট্রযন্ত্র মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর এই নির্বুদ্ধিতা পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে আরো জটিল থেকে জটিলতর করে তোলে। বাস্তবিকপক্ষে জুম্ম জনগণের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে জাতিগত সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে পরিণত করার জন্যেই শাসকগোষ্ঠী এই ষড়যন্ত্র করে আসছে।

দীর্ঘ দুই যুগের অধিক সশস্ত্র সংগ্রামের পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে উপনীত হয়েছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেছে। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান করার বিধান করা হয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সমন্বয়ে বিশেষ শাসনব্যবস্থার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, চুক্তির ২৫ বছর পরেও এখনো চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোও বাস্তবায়ন করা হয়নি। শান্তির শ্বেত কপোতগুলি আকাশে উড়ার আগেই যেন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে এবং পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি এখনও অধরাই থেকে গেছে। ফলশ্রুতিতে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বয়ে যে বিশেষ শাসনব্যবস্থা, সেই বিশেষ শাসন কাঠামো তার মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, পর্যটন ইত্যাদি বিষযগুলো এখনও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নিকট যখাযথভাবে হস্তান্তর করা হয়নি।

পক্ষান্তরে সেনাবাহিনী ও তিন পার্বত্য জেলার ডেপুটি কমিশনারগণ নিজেদের ইচ্ছামাফিক পার্বত্য চুক্তিকে লঙ্ঘন করে তাদের কার্য সম্পাদন করে চলেছে। বিশেষ শাসনব্যবস্থার কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় না করে বরং তাদেরকে পাশ কাটিয়ে তারা চুক্তি বিরোধী কাজ চালিয়ে নিচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে পার্বত্য চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। চুক্তির ২৫ বছর পরে এসে আমরা এমন এক সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রান্ত করতে চলেছি, যেখানে প্রতিনিয়ত পাহাড়ের গণমানুষের মৌলিক অধিকারকে ভূলন্ঠিত করা হচ্ছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে রাষ্ট্রের এবং সরকারের সদিচ্ছা আমরা কোনোভাবেই দেখতে পাচ্ছি না। বরঞ্চ চুক্তিপূর্বের ন্যায় রাষ্ট্র আবারো তার নগ্নতা আর উন্মত্ততা নিয়ে একের পর এক জুম্মস্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে দিন দিন চুক্তির আগের মতো সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এসবের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে সরকারের ভ্রান্ত নীতিই একমাত্র দায়ী!