ঢাকায় গণমিছিল ও সমাবেশ: ২৫ বছরেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ ও নিন্দা

0
721

হিল ভয়েস, ২০ ডিসেম্বর ২০২২, ঢাকা: ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সম্মিলিত বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সম্মিলিত গণমিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে ২৫ বছরেও পার্বত্য চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করা হয়েছে এবং চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণাসহ ৫ দফা দাবিও জানানো হয়েছে।

আজ ২০ ডিসেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার ঢাকার শাহবাগে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক গণমিছিল ও সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’ আয়োজিত সংহতি সমাবেশটি সকালে ১১:০০টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গন থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগে এক সংহতি সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন এর যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন এর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দেশের প্রগতিশীল বিভিন্ন ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সংহতি সমাবেশে বক্তারা ২৫ বছরেও পার্বত্য চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণাসহ যথাযথ কর্মসূচি গ্রহণের জোর দাবি জানান।

সংহতি বক্তব্যে বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি ও সাংসদ রাশেদ খান মেনন বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব কেবল পার্বত্যবাসীর নয়। এই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের, আমাদের সকলের।

বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ আরো বলেন, ২৫ বছরেও চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। পাহাড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ, জঙ্গিদের ট্রেনিং হচ্ছে। এই জঙ্গিরা আমাদের শান্তি ও উন্নয়নে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। এটা প্রমাণ করে যে, এই চুক্তি কেবল আদিবাসীদের জন্য নয় বাঙালিদের জন্য এবং সর্বোপূরী দেশের সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বাঙালি ও আদিবাসীর ঐকবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা না যায় তবে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও মনে করেন এই সাংসদ।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, যেই সরকার চুক্তি করেছিল সেই সরকারের আমলে পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর পর চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য আমাদের রাজপথে দাঁড়াতে হবে – এমনটা কাম্য ছিল না। স্বাধীনতার মাধ্যমে ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল সেই সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়া হয় নাই। এই সময়ে এসে আদিবাসীদের পরিচয়কে অস্বীকৃতির মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতি এক ধরণের অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছে বলে আমি মনে করি। তাই আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরী হয়েছে। পাহাড়ে উপনিবেশিক কায়দায় শাসন শোষণ অব্যাহত রয়েছে। সেখানে মানুষের জীবন নিরাপদ নয়, নিরাপত্তাহীনতায় বাস করতে হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলার শ্রমিক, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষের লড়াইয়ের মত এই লড়াইটাও সম্পর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ। আজকে পাহাড়ে ঢুকতে গেলে জাতীয় পরিচয় পত্র দেখাতে হয়। সমতলের কোথাও এমন নজির নেই। তাহলে একই দেশে দ্বৈত শাসন হবে কেন বলেও প্রশ্ন রাখেন এই সাবেক সাংসদ।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ এর সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ২৫ বছর একটি রাষ্ট্রের জন্য অনেক সময়। ১৪ বছর একটি রাজনৈতি দলের জন্যও দীর্ঘ সময়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই সময়ের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব। তাহলে আমরা কী বলবো এই চুক্তির আরেক পক্ষের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে ? চুক্তির পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইউনেস্কো শান্তি পুরষ্কার পেয়েছিল। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি এক পক্ষ পুরস্কৃত, আরেক পক্ষ প্রতারিত। চুক্তি যারা করেন তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকে চুক্তি বাস্তবায়ন করার, তাহলে কী সরকার ও রাষ্ট্র দায় এড়িয়ে গেলেন বলে প্রশ্ন তুলেন তিনি।

আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ও সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, মনে রাখা দরকার একদিকে শান্তি চুক্তি করবেন, অন্যদিকে আদিবাসীদেরকে সংখ্যালঘু করতে বাইরে থেকে পাহাড়ে লোক নিয়ে যাবেন তা ঠিক নয়। তিনি সরকারকে অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিও জানান।

ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক বলেন, এই বিজয়ের মাসে আমাদেরও কিজয় মিছিল করবার কথা ছিল। কিন্তু দু:খের বিষয় যে সরকারের সাথে চুক্তি হয়েছিল সেই সরকার বর্তমানে ক্ষমতায় থাকার পরেও চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে। চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে সারাদেশে গণআন্দোলন গড়ে তোলারও আহ্বান জানান।

এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা সংহতি বক্তব্যে বলেন, চুক্তির ২৫ বছরে আমাদের উৎসব করার কথা, তা আমরা করতে পারছি না। আমরা উৎসব করছি তবে তা সংগ্রামের এবং প্রতিবাদের ভাষায়। সামরিক শাসন গণতন্ত্রের জন্য লজ্জার। গণতন্ত্র চাইলে পাহাড়ে সামরিক শাসন বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে যাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদেরকে সমতলে পুনর্বাসন করতে হবে এবং তার জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখারও জোর দাবি জানান তিনি।

বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওানা হাসান বলেন, ২৫ বছর আগে যে চুক্তি হয়েছিল মনে করেছিলাম সেখানে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শান্তির উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে সেখানে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শান্তি ছিল না। অবিলম্বে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পার্বত্য চুক্তির পর যতগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে তার বিচার করারও দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, জাতীয়তাবাদী, ধর্মীয়, পুরুষতান্ত্রিক যতধরণের আধিপত্যবাদ রয়েছে সেগুলো গণতন্ত্রের পক্ষে যায় না। গণতন্ত্র চাইলে আধিপত্যবাদকে পরিহার করতে হবে। তিনি সমাবেশের পাঁচদফা দাবি ও আগামী দিনের সকল আন্দোলনে সংহতি জানান।

সভাপতির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দেলনের যুগ্ম-সমন্বয়কারী জাকির হোসেন বলেন, পাহাড়ি মানুষের সাথে বাঙালিদের সংহতি বাড়াতে হবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের স্বপক্ষে পাহাড়ি-বাঙালির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলে এই চুক্তির সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই আন্দোলনে সকলকে যুক্ত হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ভূমি ও আইন বিষয়ক সম্পাদক উজ্জ্বল আজিমের সঞ্চালনায় উক্ত সমাবেশে প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দেলনের যুগ্ম-সমন্বয়কারী ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি তার বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবিনামা উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হল-

১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান করতে হবে।
৩. আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক করা এবং স্থানীয় শাসন নিশ্চিত করতে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক এসব পরিষদের যথাযথ ক্ষমতায়ন করতে হবে।
৪. পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’কে কার্যকরের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাঁদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. দেশের মূলস্রোতধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

উক্ত সমাবেশে আরও সংহতি জ্ঞাপন করেন নাগরিক উদ্যোগ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ, ঐক্যন্যাপ, জন উদ্যোগ, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, গণ ফোরাম, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, কাপেং ফাউন্ডেশন, আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, এএলআরডি, আইপিডিএস, বেলা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, আরডিসি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্লাস্ট ।