খাসি আদিবাসীদের উপর মিথ্যা মামলা, হয়রানি ও ভূমি দখলের চেষ্টায় নাগরিক সমাজের উদ্বেগ

0
346

হিল ভয়েস, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ঢাকা: মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ডুলুকছড়া পুঞ্জির খাসি আদিবাসীদের উপর মিথ্যা মামলা, ভূমি দখলের চেষ্টা ও হয়রানির ঘটনায় উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর এক মত বিনিময় সভা ঢাকার আসাদগেইটস্থ ওয়াইডব্লিউসিএ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। মত বিনিময় সভায় খাসি জনগোষ্ঠীর বসবাসের এলাকায় জমি দখলের চেষ্টা ও তাদের পানজুম কেটে উজাড় করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা এবং তাদের নামে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়।

গতকাল ২৬ নভেম্বর ২০২২ সকাল ১১:০০ টায় কাপেং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জাতীয় কমিটির সদস্য ফারহা তানজীম তিতিল, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার কর্মী ও সিনিয়র সাংবাদিক রাজীব নূর, বাপা’র নির্বাহী কমিটির সদস্য ফাদার যোসেফ, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী পারভেজ হাসেম, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসান, এএলআরডির কর্মকর্তা কিশোর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা প্রমুখ। সভা মূল প্রতিবেদন পাঠ করেন কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারহা তানজীম তিতিল এবং সঞ্চালনা করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী হেলেনা তালাং।

আরপিলস মারলিয়া ডলুকছড়া পুঞ্জিবাসী সবাইকে পাশে থাকার অনুরোধ করে বলেন, বনবিভাগ বারবার মিথ্যা মামলা দিয়ে অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ দিচ্ছে। পুঞ্জিতে এমন হয়েছে বর্তমানে মামলার পেছনে টাকা খরচ করতে করতে সন্তানের শিক্ষার খরচ বহন করতে ব্যর্থ হয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে অনেক ছাত্রছাত্রী। যে কোনো মুহূর্তে আমাদের উচ্ছেদ ও পানজুম ধ্বংস করতে পারে বনবিভাগসহ স্থানীয় ভূমিদস্যুরা। একারণে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় দিন পার করছি।

এ্যাডভোকেট মো. আবুল হাসান বলেন, খাসি জনগোষ্ঠী বংশ পরম্পরায় প্রাকৃতিকভাবে বন ব্যবস্থাপনা করছে। সেই বনকে টিকিয়ে রাখতে হলে বনের মালিকানা সেই জনগোষ্ঠীর কাছে রাখা দরকার বলে তিনি মনে করেন। সেই সাথে খাসি জনগোষ্ঠীকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি থেকে তাদের মুক্ত রাখার আহ্বান জানান।

এ্যাডভোকেট পারভেজ হাসেম বলেন, বনে যারা বসবাস করছেন তারা আজ সেই বনে পরবাসী হয়ে আছেন। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের উচিত ভূমি লিজ দেয়ার ক্ষেত্রে দেখা উচিত যে, এই বনের সাথে কারা সংশ্লিষ্ট আছেন। প্রশাসন কর্তৃক ভূমি লিজ দেয়ার ক্ষেত্রে বনবাসীদের গুরুত্ব না দিয়ে বন নিয়ে যারা মুনাফা লাভ করতে পারেন তাদেরকে গুরত্ব দেয়া হয়। ফলে তাদের আগ্রাসী মনোভাব, মুনাফার জন্য ট্যুরিজম সম্প্রসারিত করার জন্য ভূমি দখলের দিকে নজর দেন। ভূমি দখলের জন্য বনবাসীদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া হয়। তিনি খাসি জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদকরণ কীভাবে রোধ করা যায় এবং সমতলের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানান।

পাভেল পার্থ বলেন, রাষ্ট্র তার বিভিন্ন এজেন্সি’র মাধ্যমে বিরোধ তৈরি করে রাখছে বনে বসবাসকারী আদিবাসীদের সাথে। খাসি জনগোষ্ঠীর মানুষ যে পদ্ধতিতে পানচাষ করে তা হতে পারত একটি ঐতিহ্যগত পদ্ধতি ও খাসি অধ্যুষিত এলাকা হতে পারত বিশেষ কৃষি ঐতিহ্য অঞ্চল। তিনি আরো বলেন, আদিবাসীদের অধিকার সম্পর্কে স্থানীয় সাংবাদিকসহ অন্যান্যদেরকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম করা এবং নাগরিক মঞ্চের মাধ্যমে আদিবাসীদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য তুলে ধরা জরুরী বলে জানান।

রাজীব নূর বলেন, খাসি পুঞ্জিতে ভূমি দখলের জন্য আক্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সব জায়গায় বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ভূমি দখলের ঘটনা বেশি ঘটছে।

জাকির হোসেন বলেন, আমাদের সবাইকে নিয়ে সমন্বিত একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। সেই সাথে সবার সমন্বয়ে ভাল প্রতিবেদনের দিকে নজর দিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সাংবাদিকদের এবিষয়ে অবহিতকরণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

বাপা’র নির্বাহী কমিটির সদস্য ফাদার যোসেফ বলেন, মৌলভীবাজারের খাসি জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদকরণের যে প্রক্রিয়া সেটা দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া বর্তমানে প্রকট আকারে ধারণ করছে। সেই প্রক্রিয়ায় তাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে অর্থনৈতিক পীড়ন ও মানসিক পীড়ন দিয়ে সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য প্রদান করেন।

কাপেং ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক হিরণ মিত্র চাকমা সবাইকে এই সব ঘটনার ফলো-আপ রাখার জন্য তিনি সবার প্রতি অনুরোধ করেন।

তিনি বলেন, আদিবাসী এলাকায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আদিবাসীদের কোনঠাসা করার জন্য মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির ঘটনা এখন অহরহ হচ্ছে।