সাহিত্য হতে পারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠ

শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যা

সাহিত্য হলো সমাজের আয়না। একজন লেখক তার লেখায় যে গল্প বা কবিতা রচনা করেন, তাতে সমাজ এবং সংস্কৃতির ছবি ফুটে ওঠে। সাহিত্য মানুষকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে শেখায় এবং তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে।

কবি বা লেখক তার লেখার মাধ্যমে অনেক সময় পাঠকদের অনুপ্রেরণা জোগায়, জীবনের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার শক্তি দেয় এবং নতুন কিছু করার সাহস তৈরি করে। একজন কবি বা সাহিত্যিকের লেখা একটি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। তাদের সৃষ্টিকর্ম নতুন ভাবনা ও চর্চার জন্ম দেয়, যা সমাজে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়।

সাহিত্যের ইতিহাস দেখিয়ে দিয়েছে যে, কবি, লেখক এবং সাহিত্যের গুণীজনরা শুধু শব্দের শিল্পী নয়, তারা মানবিক দায়িত্ববোধের দিগন্তে দাঁড়িয়ে সমাজের নৈতিক কম্পাস হয়ে থাকেন। সমাজে অন্যায়, নিপীড়ন বা বৈষম্য লুকিয়ে থাকলেও, সাহসী লেখার শক্তি তা বেরিয়ে আনতে সক্ষমতা রাখে। মানব সমাজের ইতিহাসে সাহিত্য সবসময়ই কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ বা নাটক—সবই মানুষের চেতনা, অধিকার, লড়াই সংগ্রাম, সমাজের বাস্তবতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন ঘটায়। সাহিত্যের গুণীজনরা আমাদের শিখিয়েছেন, সাহিত্যের প্রকৃত মূল্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নিপীড়িতদের কণ্ঠ হয়ে দাঁড়ায় এবং সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার বার লিখেছেন, মানুষের অন্তরের সত্যকে প্রকাশ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই কবি ও লেখকের মূল কর্তব্য। তিনি দেখিয়েছেন, সাহিত্য যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, তখন তা ব্যক্তিকে জাগ্রত করে, সমাজকে সচেতন করে এবং নিপীড়িতের জন্য আশার আলো তৈরি করে। এমনই দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রাখেন কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি ভাষা, কলম এবং গানের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন; তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহসী কণ্ঠ কখনোই নিঃশব্দ হয় না।

কবি ও লেখকের প্রধান দায়িত্ব হলো সমাজ, মানবতা ও বাস্তবতাকে গভীর পর্যবেক্ষণ করে সেগুলোকে সাহিত্যের ভাষায় প্রকাশ করা, যা পাঠককে ভাবায়, অনুপ্রাণিত করে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চালিত করে তাদের কর্তব্য সত্যনিষ্ঠ থাকা, ভাষা ও শিল্পের সঠিক ব্যবহার করা এবং সামাজিক সমস্যা ও মানবিক অনুভূতিগুলো তুলে ধরে পাঠক ও সমাজের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, যা সাহিত্যকে অমরত্ব দান করে।

কবি ও লেখকদের দায়িত্ব শুধুমাত্র শব্দ সাজানো নয়। তাদের দায়িত্ব হল -সমাজের অস্পষ্ট অন্ধকারে আলো পৌঁছানো, অন্যায়ের চিহ্নিতকরণ এবং মানুষের অন্তর্দৃষ্টি জাগানো। যারা চুপ করে থাকে, তারা হয়তো সহজ পথ বেছে নেয়; কিন্তু চুপ থাকা কখনোই অন্যায় রোধ করতে পারে না। চুপ থাকা স্বীকারোক্তির সমতুল্য। যেমন, নির্যাতন বা অবিচারের সামনে নীরব থাকা মানে সেই অন্যায়কে অনুমোদন করা।

সাহিত্যের শক্তি এখানে প্রমাণিত হয় যে, একটি কবিতা কখনোই সেন্সরশিপ বা শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভয়কে রোধ করতে পারবে না হয়তো, কিন্তু তা মানুষের মনকে স্পর্শ করবে, প্রশ্ন তুলবে, এবং চেতনার সীমানা প্রসারিত করবে। একজন লেখক যখন লিখেন, তিনি শুধু একটি ঘটনা নথিভুক্ত করছেন না, তিনি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক নির্দেশও প্রতিষ্ঠা করছেন। ইতিহাস সাক্ষী যে, সব সময় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে সাহসী লেখক ও কবিরা ছিলেন। তারা ক্ষমতার চোখ রাঙানি বা সমাজের চুপচাপ নিঃশব্দতার ভয়ে থেমে থাকেননি। তাদের সাহসই পরবর্তীতে জনগণের চেতনা এবং ন্যায়বিচারের জন্য শক্তি হয়ে উঠেছে।

সমাজে আজও অবিচার, বৈষম্য এবং নিপীড়ন হয়ে আসছে। এই সময়ে একজন কবি বা লেখক থেমে থাকলে সমাজ হারাবে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদী কণ্ঠ। কিন্তু যারা সাহস দেখায়, তারা শুধু অন্যায়কে চিহ্নিত করেনি; তারা মানুষের জন্য আশা, দিকনির্দেশনা এবং নৈতিক নির্দেশ স্থাপন করেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণের নিপীড়ন ও কঠিন বাস্তবতায় এই দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জোরপূর্বক ভূমি বেদখল, সামরিকীকরণ ও সহিংসতা, নিপীড়ন, নির্যাতন এবং বহু নারী ধর্ষণের মতন ঘটনার বিরুদ্ধে আওয়াজ করা অনেক কণ্ঠ হারিয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে সাহিত্য শুধু শিল্প নয়; ন্যায়ের দাবিতে এক দুঃসাহসিক কন্ঠ। কবি ও লেখকদের নীরব থাকা শোভা পায় না। অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরা, সত্য বলার সাহস দেখানো এবং সমাজকে পরিবর্তন করা কবি বা লেখকের সৌন্দর্যের প্রকৃত রূপ। গুণীজনরা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, সাহসী লেখা কখনোই ব্যর্থ হয় না। কলমের শক্তি, শব্দের শক্তি বিস্ফোরিত হয়ে অন্যায়কে আঘাত করে। সাহসী কণ্ঠই নিপীড়িতের জন্য প্রতিরক্ষা, অন্যায়ের জন্য সতর্কবার্তা এবং ন্যায়ের জন্য শক্তি হয়ে ওঠে। কবি ও লেখকদের কলমের ভাষা হলো সমাজে আলোর রশ্মি।

আমি বিশ্বাস করি, মানুষ শুধু বাধা বিপত্তির সঙ্গে বুঝতে বুঝতে এগোয় না, সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এগোয়। প্রতিবন্ধকতা জয়ের ক্ষমতাই কবি বা লেখককে অন্যদের থেকে আলাদা মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। একজন কবি বা লেখকের নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করা উচিত। কারণ লেখার মাধ্যমে সে মানুষের হৃদয়কে উদ্বোধিত করার সুযোগ পায়, মানুষকে মনে করিয়ে দিতে পারে তার সাহসের গরিমা, আশা, সম্মান, ত্যাগ এবং মর্যাদাকে, যা কিনা আজ নেহাত অতীতের ঐশ্বর্য হয়েই থেকে গেছে। একজন কবির স্বর নিছক একজন মানুষের গড়পড়তা অনুকরণ হয়েই থাকবে না, তা হয়ে উঠবে স্তম্ভের মতো, যা বিপদ জয় করে এগোতে সাহায্য করবে মানুষকে।

More From Author

+ There are no comments

Add yours