পিসিপি লংগদু থানা শাখার ২৬তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত

হিল ভয়েস, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, রাঙ্গামাটি: “সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হোন” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) লংগদু উপজেলার চিবেরেগা এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, লংগদু থানা শাখার ২৬তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উক্ত সম্মেলন ও কাউন্সিলে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির লংগদু থানা শাখার ভূমি বিষয়ক সম্পাদক বিনয় প্রসাদ কার্বারি, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রুমেন চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি লংগদু আঞ্চলিক কমিটির সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক তপন জ্যোতি চাকমা, পিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক সুরেশ চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক সূচনা চাকমা প্রমুখ।

সম্মেলনে বিনয় প্রসাদ কার্বারি বলেন, জুম্মদের পালিয়ে যাওয়ার আর কোন রাস্তা নেই। তাই আমাদেরকে স্বভূমিকে আঁকড়ে ধরে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকার এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ছাত্র ও যুব সমাজকে অবশ্যই সংগ্রামী হতে হবে। আমরা যারা বয়োবৃদ্ধ হয়েছি তারা শুধুমাত্র বুদ্ধি পরামর্শ দিতে পারবো। কিন্তু এই ভূমিকে রক্ষার দায়িত্ব, অনাগত প্রজম্মকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব অবশ্যই তরুণদেরকে কাঁধে তুলে নিতেই হবে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও আদর্শবান নয়। ত্যাগী, আদর্শিক না হওয়ায় তারা অধিকতর সংগ্রামী হতে পারছে না। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকে জারি রাখতে হলে তরুণ সমাজকে অবশ্যই অধিকতর সাহসী হয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হতে হবে।

রুমেন চাকমা বলেন, শাসকগোষ্ঠী জুম্ম জনগণকে অস্ত্রের মাধ্যমে দমিয়ে রাখতে চায়। চুক্তি পূর্ববর্তী সময়ের ১৩টি গণহত্যা সেটি প্রমাণ করে। দীর্ঘ ২৪ বছর সশস্ত্র আন্দোলনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অর্জিত হয়েছে। এই চুক্তি আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তে লেখা চুক্তি। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কোন সরকারই রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসেনি। বরং চুক্তিবিরোধী ও জুম্ম স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়েছে। যার ফলে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব আজ গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তরুণ সমাজকে অবশ্যই ত্যাগী, সাহসী ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের আর পেছনে ফিরে তাকানোর কোন সময় নেই। এখন সময় প্রতিহত করার। প্রতিহত করার এই আন্দোলনকে অবশ্যই জোরালো করতে হবে। তরুণ ছাত্র সমাজের মধ্যে লড়াই করার যে স্পৃহা রয়েছে সেটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।

তিনি বলেন, ‘গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে পিসিপি জুরাছড়ি থানা শাখার কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও সেনা-গোয়েন্দা-প্রশাসনের সম্মিলিত বাধার মুখে সেটি সম্পন্ন হতে পারেনি। কাউন্সিলে যোগ দিতে যাওয়া পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ সফররত টিমকে নানাভাবে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখিয়ে ভয়ভীতি ও হয়রানি করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। একইভাবে এই বছরের মে মাসের ৩ তারিখও পিসিপির কাউন্সিল হতে পারেনি। প্রাক্তন সাংসদ ঊষাতন তালুকদারসহ সফর টিমকে ভিজা কিচিং ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল। জুরাছড়ির মতো জুম্ম অধ্যুষিত এলাকায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনরত ছাত্র সংগঠন পিসিপিকে সংগঠিত হতে না দেওয়া, কাউন্সিল করতে না দেওয়ার ফলাফল নিশ্চয় সুখকর হবে বলে আমরা মনে করি না। জুম্ম ছাত্র সমাজকে যদি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ রূদ্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তারা বিকল্প পথ ভাবতে বাধ্য হবে এবং বর্তমান প্রজম্ম অবশ্যই সেভাবে অগ্রসর হতে থাকবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে দুটি পক্ষ বিদ্যমান। একটি চুক্তিপক্ষ এবং আরেকটি চুক্তিবিরোধী পক্ষ। চুক্তিবিরোধী পক্ষের মধ্যে রয়েছে শাসকগোষ্ঠী ও তার সৃষ্ট প্রক্সি সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফ। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বীকৃত সব অধিকারগুলোকে লঙ্ঘিত করার জন্য ইউপিডিএফ শাসকগোষ্ঠীর ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ইউপিডিএফ তথাকথিত এগত্তরের (ঐক্যের) কথা বলে জুম্ম জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, চুক্তি ও জনসংহতি সমিতিকে নিয়ে দেশে বিদেশে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। ইউপিডিএফ চক্রের এই ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দিতে হবে।

তপন জ্যোতি চাকমা বলেন, ১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে বিভৎস লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ জন্মলাভ করেছিল। সংগ্রামী এলাকা হিসেবে আমাদের ভূমিকা আরো জোরদার হতে হবে। বর্তমানে আমাদের অস্তিস্ব সংকট। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে লড়াই সংগ্রাম ছাড়া কোন বিকল্প পথ নেই। এজন্য তরুণ ছাত্র সমাজকে রাজনৈতিক সচেতন হয়ে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে।

সুরেশ চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র লড়াকু সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ। ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত বিভক্তির সময় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দুসহ অন্যান্য সকল ধর্মীয় জনগণ নিয়ে ভারত। তৎকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল বিধায় ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শোষণ, বঞ্চনার ইতিহাস শুরু হয়েছিল। ১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ সেই শোষণের প্রমাণ। সেই শোষণ বর্তমান সময়েও চলমান রয়েছে। এই শোষণ থেকে মুক্তির পথ আমাদেরকেই বের করতে হবে। যুগে যুগে ছাত্ররাই আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে মুক্তির আন্দোলনেও তারা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে, এখনও করে যাচ্ছে। ছাত্র সমাজকে সেভাবেই প্রস্তুত হতেই হবে।

সূচনা চাকমা বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল সেখানে পুরুষদের ন্যায় নারীদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। সমাজের নারীরা যদি বিপ্লবী না হয় তাহলে একটি জাতি কখনো এগিয়ে যেতে পারবে না। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে অধিকার নিয়ে সচেতন হতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে নারী সমাজকে অধিকতর সামিল হতে হবে।

পিসিপি লংগদু থানার শাখার বিদায়ী কমিটির সভাপতি রিন্টুমনি চাকমার সভাপতিত্বে এবং বিদায়ী কমিটির সহ-সভাপতি জীবন শান্তি চাকমার সঞ্চালনায় সম্মেলন ও কাউন্সিলে স্বাগত বক্তব্য রাখেন রেনিও চাকমা।

কাউন্সিল অধিবেশন রিন্টুমনি চাকমাকে সভাপতি, রেনিও চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক ও সুজাতা চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট লংগদু থানা শাখার ২৬তম কমিটি গঠন করা হয়। নির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য প্রাচুর্য চাকমা।

More From Author