হিল ভয়েস, ৪ এপ্রিল ২০২৬, রাঙ্গামাটি: গতকাল শুক্রবার (৩ এপ্রিল) “জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী ও চুক্তি বিরোধী সকল ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করুন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকতর সামিল হোন” এই স্লোগানকে উপজীব্য করে রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), জুরাছড়ি থানা শাখার ২২তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কাউন্সিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় ছাত্র বিষয়ক সহ-সম্পাদক জুয়েল চাকমা। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জিকো চাকমা, পিসিপি’র রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি সুমন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক সূচনা চাকমা।
পিসিপির জুরাছড়ি থানা শাখার সহ-সভাপতি স্বরেশ চাকমার সভাপতিত্বে ও সহ-সাধারণ সম্পাদক কিশোর চাকমার সঞ্চালনায় সাগত বক্তব্য রাখেন থানা শাখার সদস্য নিউটন চাকমা। কাউন্সিল অধিবেশনের শুরুতে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মবলিদানকারী শহীদদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জুয়েল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি জুম্ম ছাত্র সমাজকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। এখানে জাতিগত নিপীড়ন চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জুম্মদের সংবিধানে ঠাঁই হয়নি। উপরন্তু, শাসকগোষ্ঠীর জাতিগত নির্মূলীকরণ নীতির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের আত্মপরিচয় হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। জুম্মদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে লক্ষ লক্ষ সেটেলার বাঙালি নিয়ে এসে জুম্মদের জায়গা-জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেনা-সেটেলারদের যোগসাজশে গণহত্যা চালানো হয়েছে। মোদ্দাকথা, আজ অব্দি জুম্মদের নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর নীতির পরিবর্তন ঘটেনি। চুক্তির পর একই নীতি পার্বত্য অঞ্চলে প্রয়োগ করছে। চুক্তি বাস্তবায়ন না করে চুক্তিকে বানচাল করতে হাজার রকমের ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে তারা। জুম্মদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে বিভাজন করতে নানা ধরনের তাঁবেদার গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়েছে। যাদের একমাত্র কাজ চুক্তিকে নস্যাৎ করা।
তিনি আরো বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের ২৮ বছর পরও জুম্ম জনগণের প্রত্যাশিত অধিকার বাস্তবায়িত হয়নি। অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, অপারেশন উত্তরণ বন্ধ, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন ও বিশেষ শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসকের কর্তৃত্ববাদিতা আরও জোরদার হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুরা এখনো তাদের ভূমি ফিরে পায়নি। চুক্তি রাষ্ট্রের সাথে হওয়ায় যে কোনো সরকারের দায়িত্ব এটি যথাযথ বাস্তবায়ন করা। আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্ব রক্ষায় আবারও জুম্ম ছাত্র সমাজকে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে।
জিকো চাকমা বলেন, জুম্ম ছাত্র সমাজের উপর নির্ভর করছে জুম্ম জাতীয় ভবিষ্যৎ। জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে প্রথমেই নিজেদের সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। তাই তিনি জুম্ম ছাত্রসমাজকে আত্মপরিচয়ে সচেতন, সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা, মহান পার্টির বার্তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। আপামর জুম্ম ছাত্র সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং এতে পিসিপিকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
সুমন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো আজও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এ অঞ্চলে এখনো স্থায়ী শান্তি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অপারেশন উত্তোরণের মতো পরিস্থিতি পাহাড়ে সামরিক প্রভাবকে জারি রেখেছে, যা জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। একটি নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে হলে চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণ বাস্তবায়ন অনিবার্য। এ লক্ষ্য অর্জনে জুম্ম ছাত্রসমাজকে আরও সক্রিয়, সংগঠিত এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃহত্তর আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে।
সূচনা চাকমা বলেন, আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে চলেছে। আমরা শাসকগোষ্ঠীর যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছি। জুম্ম ছাত্র সমাজকে এটা গভীরভাবে ভাবতে হবে। পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হয়। কাজেই, আমাদেরও টিকে থাকার জন্য রাজনৈতিক অধিকার আদায় করতে হবে।
অধিবেশন শেষে স্বরেশ চাকমাকে সভাপতি, কিশোর চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক ও নিউটন চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পিসিপির জুরাছড়ি থানা শাখার ২৩তম কমিটি গঠন করা হয়। নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথবাক্য পাঠ করান পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির স্কুল ও পাঠাগার সম্পাদক মামুনি চাকমা।