পিসিপি চট্টগ্রাম মহানগর ও চবি শাখার ৩২তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল সম্পন্ন

হিল ভয়েস, ৩ জানুয়ারি ২০২৬, চট্টগ্রাম: “সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজ অধিকার সামিল হউন” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গতকাল রোজ শুক্রবার (২ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আব্দুল খালেদ হল রুমে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ৩২তম বার্ষিক শাখা সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উক্ত সম্মেলন ও কাউন্সিলে উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য শরৎ জ্যোতি চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রুমেন চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা, হিল উইমেন্স ফেডারেশন কেন্দ্রীয় সদস্য কবিতা চাকমা, পাহাড়ী শ্রমিক কল্যাণ ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক জ্যোতিময় তঞ্চঙ্গ্যা প্রমুখ।

সম্মেলনে শরৎ জ্যোতি চাকমা বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রাম আমরা বরাবরই অব্যাহত রেখেছি। শাসকগোষ্ঠীর ক্রমাগত নিপীড়ন-দমনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই আমাদেরকে টিকে থাকতে হবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আমাদের কর্মীবৃন্দের অনুসন্ধানের রাজনীতি করা উচিত। এক্ষেত্রে অধ্যয়ন-অনুশীলন-বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে চৌকস জ্ঞান অর্জন করা একান্ত কাম্য। আমরা যেহেতু শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি সুতরাং আমাদেরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও অন্যান্য জ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। চুক্তি বাস্তবায়নের কঠোর আন্দোলনে জুম্ম ছাত্র সমাজের অধিকতরভাবে এগিয়ে আসা সময়ের দাবি।

রুমেন চাকমা বলেন, বিশ্বব্যাপি পরাশক্তির দেশগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহ তাদের অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছে। নিপীড়িত সকল জাতিসমূহ তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। জুম্ম জনগণও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই চলমান রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব গত একবছরে আদিবাসী জনগনের উপর নানাভাবে পড়েছে। আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথ দিনদিন কঠোরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী যেইরূপে আমাদের দমন-নিপীড়ন করে যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধেও আমাদের সেইরূপে প্রস্তুত হতে হবে। পারিপার্শ্বিক ভূরাজনৈতিক বিষয়সমূহ আমাদেরকে সূক্ষ্মভাবে ভাবতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলনে আমাদের তরুণ সমাজকে স্ব স্ব ভূমিকা মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শাসকগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত জবাব দিতে বৃহত্তর আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহন করার কোন বিকল্প নেই। পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমগুলোকে আমাদের এগিয়ে নিতে হবে। প্রত্যকটি বিষয়ে অধ্যয়ন-অনুশীলন-বাস্তবায়ন জারি রাখতে হবে।

সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার আহ্বানকে জুম্ম ছাত্র সমাজের উপলব্ধি করা একান্ত জরুরি। দেশে-বিদেশে অবস্থান করা চুক্তিবিরোধী স্বার্থপরগোষ্ঠী তারা তাদের পূর্বের ন্যায় ষড়যন্ত্র অব্যহত রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে জিইয়ে রাখার জন্য সেনা মদদপুষ্ট সেটেলার বাঙালিরা পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা চলমান রেখেছে। এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পিসিপি কর্মীদের অধিকতর সংগ্রামী, আদর্শিক ও সাহসী হতে হবে। মহান পার্টি জনসংহতি সমিতি রাজনৈতিক বাস্তবতার বিবেচনায় তার আন্দোলনের রূপরেখা নির্ধারণ করে নিয়েছে। সেই রূপরেখা অনুযায়ী ছাত্রসমাজকেও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

কবিতা চাকমা বলেন, জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার লড়াই-সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নারী যদি আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করে তবে আন্দোলন স্তিমিত হবে এবং তা হলে জাতীয় মুক্তি অসম্ভব। তার প্রয়োজনীয়তা থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সংগ্রামী পথচলা। নারী সমাজকে আরো অধিকতরভাবে সংগঠিত করে বৃহত্তর আন্দোলন সামিল হতে হবে।

জ্যোতিময় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপথ কঠিন এবং কঠোর আকার ধারণ করেছে। তার থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা আরো ভয়াবহ। পিসিপি জুম্ম ছাত্র সমাজের কাছে একটি আদর্শের নাম। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজেকে জানতে ও চিনতে হলে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদে যুক্ত হওয়ার কোন বিকল্প নেই। ছাত্র-যুব সমাজকে বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হওয়ার যে বার্তা সেটা ধারণ করে অধিকার আদায়ের মহান লক্ষ্যে এম.এন.লারমার প্রদর্শিত পথে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে।

পিসিপির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার বিদায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আদর্শ চাকমার সঞ্চলনায় কাউন্সিল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিসিপি, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার বিদায়ী সভাপতি হ্লামিউ মারমা। সম্মেলনে পিসিপি চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাংগঠনিক প্রতিবেদন পেশ করেন বিদায়ী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আশুতোষ তঞ্চঙ্গ্যা এবং পিসিপি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এনতেস চাকমা।

কাউন্সিল অধিবেশন সর্বসম্মতিক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক শাখা, খুলশী থানা শাখা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ২নং গেইট শাখার নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

এই সময় আদর্শ চাকমাকে সভাপতি, আশুতোষ তঞ্চঙ্গ্যাকে সাধারণ সম্পাদক এবং সুমান চাকমাকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট পিসিপি চট্টগ্রাম মহানগর শাখার ৩২তম কমিটি গঠন করা এবং উক্ত নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপির কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি জগদীশ চাকমা।

অন্যদিকে অন্বেষ চাকমাকে পুনরায় সভাপতি, প্রিয় জ্যোতি চাকমা (রিবেক)’কে সাধারণ সম্পাদক এবং প্রেনঙি ম্রোকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পিসিপি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ৩২তম কমিটি গঠন করা হয় এবং নবনির্বাচিত কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান পিসিপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুপ্রিয় তঞ্চঙ্গ্যা।

More From Author