হিল ভয়েস, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আন্তর্জাতিক চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল কমিশন (সিএইচটিসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (ইবগিয়া) বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকার এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়েছে। বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে, এই দুটি অধিকার বিষয়ক সংস্থা আশা করে যে, নতুন সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা এবং আদিবাসী সহ সকল সম্প্রদায়ের অধিকার সমুন্নত রাখার জন্য কাজ করবে।
গতকাল সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিএইচটিসি এবং ইবগিয়া এই আহ্বান জানিয়েছে।
সংগঠন দুটি রাঙ্গামাটি আসনের নির্বাচিত আদিবাসী সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগকে স্বাগত জানায়। একই সাথে, তারা একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে একজন আদিবাসী-বহির্ভূত প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টিও উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করে। এই ধরনের নিয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, উপজাতিদের (আদিবাসী) মধ্য থেকে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসন ব্যবস্থা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির চেতনা এবং উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন করে। একই সময়ে যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়, তখন আদিবাসীদের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন এবং চুক্তির অধীনে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য এর বিধানগুলিকে সম্মান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরেও, চুক্তির মূল বিধানগুলি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, বেসামরিকীকরণ, পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের কাছে অর্থবহ ক্ষমতা হস্তান্তর, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকরকরণ এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত আদিবাসীদের পুনর্বাসন- এখনও অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। চুক্তির এই মূল দিকগুলি বাস্তবায়নে অব্যাহত বিলম্ব এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করছে, শান্তি প্রক্রিয়া ও আদিবাসীদের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন এবং ইবগিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও উদ্বিগ্ন, যার মধ্যে রয়েছে সহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, ভূমি দখল এবং প্রাণহানি। জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং আরও এধরনের ঘটনা রোধ করতে এই ঘটনাগুলির দ্রুত, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
এইসব বিষয়ের আলোকে, টেকসই শান্তি এবং গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, এবং বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতাসমুহ পূরণ করতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন ও ইবগিয়া নবনির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের নিকট শ্রদ্ধার সাথে নিম্নোক্ত দাবি উত্থাপন করছে:
- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুসারে সাম্প্রতিক মন্ত্রণালয়ের নিয়োগকে পর্যালোচনা করা এবং ভবিষ্যতের নিয়োগ যাতে চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে তা নিশ্চিত করা;
- পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ ও বিশ্বস্ত বাস্তবায়নের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা এবং একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা;
- অগ্রাধিকার ভিত্তিতে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং ভূমি বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা;
- ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি বজায় রাখার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা;
- যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক সংশ্লিষ্ট বম সম্প্রদায়ের সদস্যদের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা;
- অবিলম্বে নিরস্ত্র বম নারী ও শিশুদের জেল থেকে মুক্তির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
- পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনসমূহ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং পর্যাপ্তভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিশন প্রতিষ্ঠা করা; এবং
- আদিবাসী প্রতিনিধি এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠনগুলির সাথে টেকসই, অর্থপূর্ণ সংলাপে অংশগ্রহণ করা।
আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং চেতনার প্রতি সম্মান জানিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং স্থায়ী শান্তির মূলনীতিকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে আপনার সম্মানিত সরকারের সাথে গঠনমূলকভাবে সহযোগিতা এবং সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে প্রস্তুত। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাথে গঠনমূলক সংলাপ এবং সম্পৃক্ততা বজায় রাখার জন্য সর্বদা প্রস্তুত।