পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

হিল ভয়েস, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদক: সারাদেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সংসদীয় আসনেও ১২ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। তিনটি আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর তিন প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হয়েছে। ২৯৯ পার্বত্য রাঙ্গামাটি সংসদীয় আসনে এডভোকেট দীপেন দেওয়ান, ৩০০ পার্বত্য বান্দরবান আসনে সাচিং প্রু জেরী এবং ২৯৮ পার্বত্য খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিজয় অর্জন করেছেন।

এবারে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আসন থেকে রাঙ্গামাটি সংসদীয় আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান পেয়েছেন সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট মোট ২,০১,৮৪৪, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমা পেয়েছেন ৩১১৪২ ভোট। অপরদিকে বান্দরবান সংসদীয় আসন থেকে সাচিংপ্রু জেরী পেয়েছেন ১,৪১,৪৫৫ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপি প্রার্থী আবু সাইদ মো. সুজাউদ্দিন পেয়েছেন ২৬,১৬২ ভোট এবং খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসন থেকে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া পেয়েছেন ১,৫১,০৪০ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমা পেয়েছেন ৬৮,৩১৫ ভোট।

উল্লেখ্য, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় সংসদের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯ আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতসহ ৫০টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে ২০২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তার মধ্যে রাজনৈতিক দলের ১,৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন প্রার্থী ছিলেন। গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৯৯ আসনের মধ্যে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি আসন, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট ৭৭টি আসন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দল ৭টি আসনে জয়যুক্ত হয়েছে।

এছাড়া, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২টি আসন- চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়। বলাবাহুল্য, বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

এ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক হাঙ্গামা ও জাল ভোটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাঙ্গামা ও ভোটকেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে সারাদেশে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জাল ভোটের চেষ্টা করায় ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আবার কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট না দিলে ভোটারদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে।

২৯৮ পার্বত্য খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার সমর্থকরা রামগড়, মানিকছড়ি, গুইমারা, মাটিরাঙ্গা ও দীঘিনালার কয়েকটি কেন্দ্রে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দীঘিনালার রসিক নাগর পাড়া কেন্দ্রে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার সমর্থকরা ভোট বাক্স ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ছিনতাইকৃত ভোট বাক্স ও ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়।

খাগড়াছড়ি জেলায় ফুটবল মার্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সমীরণ দেওয়ানের পক্ষে ক্যাম্পেইন করায় পার্বত্য চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ (প্রসিত) ৫ জনকে অপহরণ করে। তার মধ্যে ৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৯ ঘটিকার সময় পানছড়ি উপজেলার লোগাং ইউনিয়নের মাছ্যছড়া পাড়ার নিজ বাড়ি থেকে হিমেল চাকমা যুবক্কে নামে এক গ্রামবাসীকে ইউপিডিএফ (প্রসিত) সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে এবং লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়নের শীলছড়ি এলাকা থেকে ইউপিডিএফ (প্রসিত) সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কর্তৃক ১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬:২০ ঘটিকার সময় চাইথোয়াই উ মারমা, উ থোয়াই অং মারমা এবং আরেশে মারমা নামে তিন গ্রামবাসীকে অপহরণ করা হয়।

অপরদিকে একই ইউনিয়নের কুতুকছড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র থেকে নির্বাচনের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯ ঘটিকার সময়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্তৃক সমীরণ দেওয়ানের সমর্থক দন্তি পাড়ার বাসিন্দা চাইহ্লামং মারমা নামে এক গ্রামবাসীকে অপহরণ করা হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইউপিডিএফ (প্রসিত) সন্ত্রাসীরা এখনো কাউকে ছেড়ে দেয়নি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঘোড়া মার্কার প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমার পক্ষে ভোট দিতে গ্রামবাসীদের বাধ্য করতে এবং তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইউপিডিএফ (প্রসিত) গ্রুপ এই অপহরণের মতো জঘন্য কাজটি সংঘটিত করে। শুধু তাই নয়, ইউপিডিএফ (প্রসিত) গ্রুপ ঘোড়া মার্কায় ধর্মজ্যোতি চাকমাকে যিনি ভোট দিবেন না, তাকে কয়েক কেজি হাঙ্গর মাছ (অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ায় অতিথিদের খাওয়ানোর জন্য) নিয়ে উপস্থিত হতে হুমকি দেয়।

পার্বত্য এলাকায় ইতোমধ্যে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া সন্ত্রাসের গডফাদার, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও উগ্র জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচিত হলেও তার বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হওয়ার পেছনের মূল কারণ- জুম্মদের একটা সুবিধাবাদী অংশ তার পক্ষে ভোট দিয়েছে বলে অভিজ্ঞমহলের অভিমত। বিশেষ করে মারমা ভোটার এবং কিছু সংখ্যক ত্রিপুরা ও চাকমা ভোটাররা সুবিধা পাওয়ার আশায় ওয়াদুদকে ভোট দিয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

অনেকের অভিযোগ রয়েছে যে, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া জুম্ম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের বিভক্ত করা এবং সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সমীরণ দেওয়ানকে ঠেকাতে অনেক আগেই গোপন সমঝোতার মাধ্যমে বড় অংকের টাকা দিয়ে সুকৌশলে ইউপিডিএফ ধর্মজ্যোতি চাকমাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মাঠে নামিয়েছে। এমনকি এক পর্যায়ে ধর্মজ্যোতি চাকমা নমিনেশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। কিন্তু ইউপিডিএফ কৌশলে ধর্মজ্যোতি চাকমাকে তাদের হেফাজতে আটকে রেখে নমিনেশন প্রত্যাহারের দিনক্ষণ পার করে দেয়। এছাড়া কোনো কোনো জায়গায় ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের হয়রানি ও চোখ রাঙানিতে অতিষ্ট হয়ে কিছু সাধারণ জুম্মও অনন্যোপায় হয়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে ভোট দিয়েছে বলে জানা যায়।

অন্যদিকে গণভোটের প্রাপ্ত ফলাফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সংসদীয় আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফল শিট অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি আসনে- বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি আসনে ‘না’ ভোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের চেয়ে বেশি পেয়েছে। এটা অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সংস্কার প্রক্রিয়া ও জুলাই সনদ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় এবং হ্যাঁ ও না ভোট নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পার্বত্য এলাকার জনসাধারণের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং মতামতকে উপেক্ষা করার একটি ফল বলে অনেক অভিজ্ঞমহলের অভিমত।

রাঙামাটিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৭১,৬৯৯টি এবং ‘না’ ভোট পেয়েছে ১,৭৯,৮০৫টি, যা ব্যবধানের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি। এ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৯ হাজার ২৬৭ জন।

খাগড়াছগিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ১,৪৪,৩৫৫টি, আর ‘না’ ভোট পেয়েছে ১,৫৫,৯৪২টি। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৩ জন।

অন্যদিকে বান্দরবানে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৭১,৪১৭টি, আর ‘না’ ভোট পড়েছে ৯০,১৫৬টি। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,১৫,৪২২ জন।

এবারের নির্বাচনে গণভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ টি।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই জাতীয় সনদে একমত হওয়া বিষয়ের আওতায় সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই কাজ করবেন সংসদ নির্বাচনে জয়ী এমপিরা। সংসদের অধিবেশন শুরুর ১৮০ দিন পর্যন্ত তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ এর সদস্য হিসেবে পরিচিত হবেন। অর্থ্যাৎ, জুলাই সনদে একমত হওয়া বিষয়গুলোর আলোকে তারা সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনবেন।

More From Author

+ There are no comments

Add yours