পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো অগ্রগতি নেই

নিরঞ্জন চাকমা

হিল ভয়েস ৬ এপ্রিল ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় সরকার বদল হয়, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যা এবং সেখানে বসবাসকারী আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীর মানবাধিকারের পরিস্থিতির ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন ঘটে না। নতুন নতুন পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে সরকার বদল হয়, রাষ্ট্রক্ষমতার স্তরে স্তরে দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের পরিবর্তন ঘটে, জুম্ম জনগণ আশায় থাকে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে বলে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি বরাবরই অবনতির দিকে ধাবিত হতে থাকে।

২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যূত্থানে রাষ্ট্রের ইতিবাচক সংস্কার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের অঙ্গীকার নিয়ে শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেও জুম্ম জনগণ আশা করেছিল, এই সরকার বুঝি দীর্ঘ বঞ্চিত জুম্ম জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া বঞ্চনা ও নিপীড়নকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্তরিক উদ্যোগ নেবে। অচিরেই স্পষ্ট হল যে, এই সরকারও অতীতের সরকারের ব্যতিক্রম নয় এবং পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। উপরন্তু এই সরকারের মাত্র দেড় বছরের আমলেই দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও গুইমারায় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় মুসলিম সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক জুম্মদের উপর চারটি বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত করা হয়। উক্ত হামলায় ৭ জন জুম্ম নিহত, দুই শতাধিক জুম্ম আহত এবং দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভস্মিভূত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও পূর্ববর্তী সরকারের ন্যায় জুম্মদের উপর নানা দমন-পীড়ন সহ মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা অব্যাহত থাকে। যথারীতি এইসব মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার কোনো সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হতে দেখা যায়নি, যা বরাবরই মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে নিয়ে যায়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ট ভোট পাওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) নতুন সরকার গঠন করে। বলাবাহুল্য, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং বিগত সরকারের আমলে নানা দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার আলোকে বিএনপি নিশ্চয়ই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনে দেশের শাসনব্যবস্থায় ইতিবাচক ভূমিকা নেবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায়ও সঠিক ও গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসবে- এমন আশায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ জুম্মও এবারের নির্বাচনে বিএনপিকেই ভোট প্রদান করে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাঙ্গামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ছিল পার্বত্য চুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু একই দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে বাঙালি সম্প্রদায়ের নির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ছিল চুক্তির মূল স্পিরিটের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সরানোর দাবি করলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

আরও উদ্বেগের বিষয় হল, গত ১১ মার্চ ২০২৬ এক সমাবেশে নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন যে, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি আমরা ১০০ শতাংশ হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের বিষয়টা নজরে নিয়ে আসি, তাহলে আমাদের ডিফেন্স ফোর্সকে অনেক কিছু প্রয়োগ করতে দিতে পারব না।”

বলাবাহুল্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এধরনের বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা যেমন সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি অব্যাহত মানবাধিকার লংঘনকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জাতীয় মতামত মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক বলে বিবেচনা করা যায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যে সরকার আসুক না কেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টি সেনাবাহিনীর উপর ন্যস্ত থাকে। ২০০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে জারিকৃত ‘অপারেশন উত্তরণ’ নামে সেনাশাসন বলবৎ করা হয়। ‘অপারেশন উত্তরণ’- এর বদৌলতে সেনাবাহিনী সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, বিচার ব্যবস্থা, উন্নয়নসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। যে সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসুক না কেন, প্রতিটি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের পরিবর্তে ব্যাপক সামরিকায়ণ করে ফ্যাসীবাদী কায়দায় দমন-পীড়নের মাধ্যমে সমাধানের নীতি অনুসরণ করে থাকে।

বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। পূর্বের মতই নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক জুম্ম জনগণের উপর নানা ধরনের নিপীড়ন, মানবাধিকার হরণ, সেনামদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক পার্বত্য চুক্তির সমর্থক ও নিরীহ জুম্মদের উপর সন্ত্রাস এবং সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কর্তৃক জুম্মদেরকে হামলা, হয়রানি, ভূমি বেদখল ও জুম্ম নারী-শিশুদের উপর সহিংসতা ইত্যাদি অব্যাহত থাকে।

সেনাবাহিনী কর্তৃক মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও মৌলবাদী গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। তারই আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্প্রীতি জোট ইত্যাদি মুসলিম সেটেলারদের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাতিলের দাবি জানাচ্ছে।

অন্যদিকে বিএনপি সরকার আসার পর ১৬ মার্চ ২০২৬ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাধীন মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের তানিক্কাপাড়া এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর ব্যাপক সামরিক অভিযান চলে। সামরিক অভিযানের সময় যৌথবাহিনীর সদস্যরা পার্শ্ববর্তী এলাকায় থাকা পার্বত্য চুক্তির পক্ষের লোকদের লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড মর্টার শেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ করে বলে জানা যায়। মাটিরাঙ্গা সেনা জোনের জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মাসুদ খান ও মাটিরাঙ্গা জোনের কর্মকর্তা মোঃ ফারুক এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার এর একটি যৌথ দল এই অভিযান পরিচালনা করে।

২৭ মার্চ ২০২৬ রাঙ্গামাটি জেলার সদর উপজেলাধীন বালুখালি ইউনিয়ন এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। উক্ত অভিযান ১ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এবং বেশ কিছু ঘরবাড়ি তল্লাসি ও গ্রামবাসীকে হয়রানি করা হয় বলে জানা যায়। ২৫ মার্চ ২০২৬ সন্ধ্যায় রাঙ্গামটি জেলাধীন কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ওয়াগ্গা তঞ্চঙ্গ্যা পাড়ায় ওয়াগ্গা কাপ্তাই ৪১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন-এর অধীন কুকিমারা বিজিবি ক্যাম্পের ১৫-২০ জনের অধিক বিজিবি সদস্য কর্তৃক স্থানীয় জুম্মদের ব্যক্তিগত মালিকাধীন কাঠ নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা প্রদান করা হয়।

মুসলিম সেটেলার কর্তৃক জুম্মদের ভূমি জবরদখলও অব্যাহত রয়েছে। যেমন গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ লামা উপজেলার মিরিঞ্জা বাগান পাড়ায় ৬০ ত্রিপুরা পরিবারের ব্যবহৃত শ্মশান ও বসতভিটার জায়গা দখলের চেষ্টা চলানো হয়।

একইভাবে অব্যাহত রয়েছে জুম্ম নারী ও শিশুদের উপর পাশবিক সহিংসতা। রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ির সাজেকে একজন সেটেলার বাঙালি মিস্ত্রি কর্তৃক স্থানীয় একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী জুম্ম কিশোর (১৫) ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। খাগড়াছড়ি জেলাধীন মানিকছড়ি উপজেলার বড়বিল নামক এক গ্রামে রাম্রা মারমা (৪১) নামে এক আদিবাসী গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মানিকছড়ি উপজেলার মানিকছড়ি ইউনিয়নের ফকিরনালা নামক গ্রামে এক মুসলিম সেটেলার কর্তৃক এক মারমা গৃহবধুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়।

শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে নয়, বাংলাদেশের সমতল জেলাগুলোতেও সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী এক মাসে দেশব্যাপী সংঘটিত প্রায় অর্ধশতাধিক সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনাবলীর মধ্যে রয়েছে- হত্যা, ধর্ষণ, মন্দিরে হামলা ও লুটপাট, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, আদিবাসীদের বসতভিটি দখলের ঘটনা।

বস্তুতঃ সরকার পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তনের মাধ্যমে সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিতে সামান্য তারতম্য ঘটলেও রাষ্ট্রীয় নীতিতে এবং সরকারের ভূমিকায় মৌলিক ও গুণগত কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় না। যার ফলে স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও এবং পার্বত্য সমস্যা সমাধানের লক্ষে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির ২৮ বছরেও পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি এবং পার্বত্য সমস্যার যথাযথ সমাধান নিশ্চিত হয়নি। রাষ্ট্র ও সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার নিশ্চিত করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ অবহেলিত আদিবাসী জুম্মদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং পার্বত্য সমস্যার যথাযথ রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করার সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট নীতিমালা গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে বিগত ২৮ বছরেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে ধাবিত হয়েছে এবং বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় উপনীত হয়েছে।

বলাবাহুল্য, যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দুই দশকের অধিক সশস্ত্র সংঘাতের অবসান হয়েছে, জনসংহতি সমিতি জুম্ম জনগণের স্বায়ত্তশাসনের লক্ষে পরিচালিত সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে সরে এসে সরকারের নিকট অস্ত্র জমা দিয়েছে এবং যে চুক্তিতে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের পথ দেখানো হয়েছে, সেই চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার টেকসই সমাধান এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারকেও এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে হবে। পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন যতই বিলম্বিত হবে ততই পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি জটিলাকার ধারণ করবে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি ঝুঁকির মুখে পড়তে বাধ্য হবে।

সূত্র: দৈনিক সংবাদ, আগরতলা।

More From Author