পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের প্রধান সামাজিক ও জাতীয় উৎসব-২০২৬ উপলক্ষে পিসিপি ও এইচডাব্লিউএফের শুভেচ্ছা বার্তা

হিল ভয়েস, ১২ এপ্রিল ২০২৬, রাঙ্গামাটি: জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও অপ-সংস্কৃতি প্রতিরোধে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের প্রধান সামাজিক ও জাতীয় উৎসব ‘বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, চাংক্রান, সাংক্রাই, সাংগ্রাইং, সাংলান, পাতা-২০২৬’ উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডাব্লিউএফ) এক যৌথ বার্তায় শুভেচ্ছা জানিয়েছে।

উক্ত বার্তায় বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী ১৪টি জুম্ম জাতিসমূহের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাণপ্রবাহের আগমনী বার্তা নিয়ে বছর পেরিয়ে আবারও হাজির হতে চলেছে প্রাণের এই উৎসব। সর্ববৃহৎ এই উৎসবটিকে ম্রো’রা চাংক্রান, চাক’রা সাংগ্রাইং, মারমা’রা সাংগ্রাই, ত্রিপুরা’রা বৈসু/বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যা’রা বিষু, অহমিয়া’রা বিহু, খুমি’রা সাংক্রাই, খেয়াং’রা সাংলান, সাঁওতাল’রা পাতা ও চাকমা’রা বিজু নামে স্বকীয় জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে সমুন্নত রেখে ঐতিহ্যবাহী নানা আয়োজনে আনন্দমুখর ও ধর্মীয় আবহে উদযাপন করে থাকেন।

ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্য এবং তারিখজনিত পার্থক্য থাকলেও এই উৎসবের মূল তাৎপর্য, আবেদন ও চেতনা এক ও অভিন্ন এবং বস্তুত: এটি একটি সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসবটি পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের যাপিত জীবনের বৈচিত্র্যময়, ঐহিত্যবাহী ও অনন্য সংস্কৃতির অন্যতম মূল উপাদান। বস্তুতপক্ষে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে জুম্ম জনগণের মাঝে এ উৎসবের ঐতিহ্যগত ও আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। স্মরণাতীত কাল থেকে উদযাপিত হয়ে আসা এই উৎসবটি জুম্ম জনগণের জাতীয় জীবনের সাংস্কৃতিক সুষ্ঠু বিকাশ ও সামাজিক ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে তাৎপর্য্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

বার্তায় আরো বলা হয়, ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবটি যতই ঘনিয়ে আসে ততই জুম্ম জনগণের জাতীয় জীবনে যেমনি ঐক্য, সাম্য, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির দিন হিসেবে শিহরণ সৃষ্টি করে তেমনি জুম্ম জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামগ্রিক বাস্তবতার নিরিখে পার্বত্যবাসীর মনে জাগিয়ে দেয় উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা। প্রাণের এই উৎসব শুরু হওয়ার ঠিক দুইদিন পূর্বে ঘটে যাওয়া ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিলের ভয়াল সেই দিনটির কথা জুম্ম জনগণ কখনও ভূলতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্বাক্ষরের পরও শাসকগোষ্ঠীর ধারাবাহিক দমন-নিপীড়নের কারণে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব আজ বিপন্ন ও হুমকির সম্মুখীন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর ছত্রছায়ায় উগ্র মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক মুসলিম বাঙালি সেটেলার কর্তৃক সাম্প্রদায়িক হামলায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ৭ জন জুম্ম নিহত, দুই শতাধিক জুম্ম আহত এবং দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভস্মিভূত করা হয়। কিন্তু ভয়াবহ এসব সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের কাউকেই বিচারের আওতায় আনা হয়নি। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও উক্ত সাম্প্রদায়িক হামলাসমূহ বিচারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। উপরন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের অ-নিবাসী একজনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে সরাসরি লঙ্ঘন করেছে। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না, জুম্ম জনগণসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের মতামতকে উপেক্ষা সরকারের কোনো ধরনের উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হবে না, বরং পরিস্থিতি জটিল করে তুলবে। পার্বত্যবাসী প্রত্যাশা করে, অতীতের ভূলগুলো শুধরে নিয়ে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণার্থে বিএনপি সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে।

পিসিপি ও এইচডাব্লিউএফের বার্তায় বলা হয়, বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হলেও পরবর্তী সময়ে জাতীয় জীবনে সেটির প্রতিফলন যথাযথভাবে পরিলক্ষিত হয় নি। জুম্ম জনগণসহ আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের আত্ম পরিচয়ের অধিকার আজও চরমভাবে উপেক্ষিত। যথাযথ শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত থাকা জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশ স্বনির্ভর হয়ে উঠতে না পারার দরুন সুষ্ঠু সংস্কৃতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে জুম্ম সংস্কৃতিতে নানা ধরনের অপ-সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এমতাবস্থায় অপ-সংস্কৃতি প্রতিরোধ, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও রীতি-নীতিসমূহ চর্চা ও বিকাশ সাধনে সকলের সচেষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়।

বার্তায় বলা হয়, জুম্ম জনগণের প্রধান উৎসব উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি ছুটি না থাকায় শিক্ষার্থীরা পরিবারসহ উৎসব উদযাপন করতে পারে না। এ কারণে পিসিপি ও এইচডাব্লিউএফ ৫ দিনের ছুটির দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জুম্ম শিক্ষার্থীরাও একাডেমিক ক্যালেন্ডারে ছুটি অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছে। তবে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজ বাড়িতে গিয়ে উৎসব পালন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবুও তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজ উদ্যোগে ও নতুন উদ্দীপনায় উৎসব উদযাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উৎসবমুখর দিনে সরকারের নিকট নিমোক্ত দাবিসমূহ করা হয়:

১. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ৫ (পাঁচ) দিন সরকারি ছুটি প্রদান করা;

২. পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের ভাষা, সাহিত্য, ক্রীড়া, সংস্কৃতি সংরক্ষণ, প্রতিপালন ও গবেষণার জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা;

৩. সময়সূচি ঘোষণাপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

এছাড়াও উৎসবমুখর দিনে জুম্ম জনগণের প্রতি নিম্নোক্ত আহ্বান জানানো হয়:

১. সকল ক্ষেত্রে স্ব স্ব আত্ম-পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমুন্নত রাখা;

২. জুয়া খেলাসহ সকল ধরণের অপ-সংস্কৃতি বর্জন ও প্রতিরোধ করা;

৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে অধিকতর সামিল হওয়া।

More From Author

+ There are no comments

Add yours