নারীর অগ্রযাত্রায় পুরুষ নয়, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারাই প্রধান অন্তরায়: রাঙ্গামাটিতে ঊষাতন তালুকদার

হিল ভয়েস, ৮ মার্চ ২০২৬, রাঙ্গামাটি: রাঙ্গামাটিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেছেন, নারীর অগ্রযাত্রার পথে পুরুষ কখনোই প্রধান অন্তরায় নয়; প্রকৃত অন্তরায় হলো সমাজে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারা, যা নারীর সম্ভাবনাকে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে।

আজ ৮ মার্চ ২০২৬ সকাল ১০টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে রাঙ্গামাটির জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভার আগে শিল্পকলা একাডেমি থেকে র‌্যালি শুরু হয়। র‌্যালিটি জেলাপ্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে আবার জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এসে শেষ হয়। বেলুন উড়িয়ে র‌্যালি উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ সভাপতি ঊষাতন তালুকদার।

আলোচনা সভায় হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য কবিতা চাকমা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুবিনা চাকমা যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মনি চাকমা সভাপতিত্ব করেন।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শিশির চাকমা, বিশিষ্ট আইনজীবী জুয়েল দেওয়ান, সমাজকর্মী কক্সি তালুকদার, পিসিপির কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি জগদীশ চাকমা এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ম্রানুচিং মারমা। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য এলি চাকমা এবং বিবৃতি পাঠ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক জ্যোতি পাংখোয়া।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঊষাতন তালুকদার বলেন, আমাদের সমাজে নারীরা নানাভাবে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে নারীর অগ্রযাত্রা বহু ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কারের মাধ্যমে তাদের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। তবুও নানা প্রতিকূলতা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যেও জুম্ম নারীরা এগিয়ে চলেছে দৃঢ় প্রত্যয়ে।

তিনি বলেন, পরিবার ও সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে অতিক্রম করে একজন জুম্ম নারীকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত হতে হয়। এই পথচলা কখনোই সহজ বা মসৃণ নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের একদিকে সমাজব্যবস্থার বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। তবুও আজ জুম্ম নারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা দেশ ও জাতির পরিচয় বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছে।

তিনি আরও বলেন, নারী সমাজকে নারীমুক্তির আদর্শে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী হতে হবে। নারীর অগ্রযাত্রার পথে পুরুষ কখনোই প্রধান অন্তরায় নয়; প্রকৃত অন্তরায় হলো সমাজে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারা, যা নারীর সম্ভাবনাকে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিশির চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাদেশে নারীদের সামগ্রিক অবস্থা এখনও অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক নারী বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। প্রান্তিক, বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে পাহাড়ের নারীরা বহুমাত্রিক সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় নীতি ও অসম সামাজিক কাঠামোর কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরেই অনগ্রসর অবস্থায় রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে নারীরা বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর দ্বারা যুগের পর যুগ ধর্ষণ ও নানা ধরনের যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে আসছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি, এমনকি অনেক ঘটনার যথাযথ তদন্তও হয়নি। রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবেই জুম্ম নারীদের প্রায়শই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, গুম, যৌন নিপীড়ন ও শ্লীলতাহানির ঘটনা এখানে বারবার ঘটতে দেখা যায়। নারীর উপর সহিংসতার শিকার হয়েছে হিল উইমেন্স ফেডারেশনও। ১৯৯৬ সালে সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও নারীনেত্রী কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করা হয়, যার আজও কোনো সন্ধান মেলেনি। দীর্ঘ ৩৮ বছরের পথচলায় হিল উইমেন্স ফেডারেশন বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে আছে।

বিশিষ্ট আইনজীবী জুয়েল দেওয়ান বলেন, জুম্ম ছাত্রী সমাজের অগ্রণী সংগঠন হিসেবে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে। সংগঠনটি সেই দায়িত্ব নিষ্ঠা ও অঙ্গীকারের সাথে পালন করে আসছে। ইতিহাসে দেখা যায়, যে কোনো গণআন্দোলন বা রাজনৈতিক সংগ্রামে শাসকগোষ্ঠীর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন নারীরাই। এ ক্ষেত্রে তারা নানাভাবে সহিংসতার শিকার হন—যেমন ধর্ষণ, হত্যা, গুম, এমনকি জোরপূর্বক ধর্মান্তরের মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্যেই নারী অধিকারসহ সকল মানুষের ন্যায্য অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। তাই হিল উইমেন্স ফেডারেশন চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে নারী সমাজকে আরও সংগঠিত ও সক্রিয় করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

আইনজীবী ও সমাজকর্মী কক্সি তালুকদার বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মধ্যেই আপামর জনগণের ন্যায্য অধিকার নিহিত রয়েছে। তাই এই চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে জুম্ম নারীদের আরও জোরালো ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে নারী সমাজ এখনও পর্যাপ্ত সচেতন নয়। অনেক নারী নিজের ব্যক্তিগত অধিকার সম্পর্কেও সচেতনভাবে ভাবেন না বা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন না।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন আইন ও নীতিমালায় নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে নারীদের বাস্তব অবস্থা এখনও অত্যন্ত শোচনীয়। সামগ্রিকভাবে জাতিগত ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করা কঠিন।

ছাত্র নেতা জগদীশ চাকমা বলেন, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সংগ্রামী পথচলা আজ ৩৮ বছরে পদার্পণ করেছে। এই লড়াকু সংগঠনটি জুম্ম নারী মুক্তি এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে নারী মুক্তি কেবল পৃথকভাবে সম্ভব নয়; এর জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত সংগ্রাম অপরিহার্য। আমাদের সমাজে নারীদের অবস্থান এখনো অনেক ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ। একই সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের শিকারও তারাই বেশি। তাই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন না হওয়া পর্যন্ত জুম্ম নারীর প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়, এবং তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাবে না।

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ম্রানুসিং মারমা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে আমাদের গৌরবময় সংগ্রামের উজ্জ্বল অধ্যায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর গণহত্যা, ধর্ষণ, উচ্ছেদ, ভূমি বেদখল এবং সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে আমরা বরাবরই দৃঢ় ও বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছি। জেএসএসের নেতৃত্বে যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিল, সেই উত্তাল সময়ে জুম্ম নারীদের জাগ্রত করা এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সংগ্রামে নারী সমাজকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এই লড়াকু সংগঠন কখনোই তার অবস্থান থেকে পিছিয়ে যায়নি। যখনই জুম্ম নারীদের উপর সেনা–সেটেলার যোগসাজশে যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তখনই হিল উইমেন্স ফেডারেশন প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে। জুম্ম নারী মুক্তি আন্দোলন এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। মহান পার্টির নেতৃত্বে এবং জুম্ম ছাত্রী সমাজকে সাথে নিয়ে আমরা পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনকে আরও বেগবান করবো।

More From Author