ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটারদের সম-নির্বাচনী পরিবেশের দাবিতে সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটসের সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

হিল ভয়েস, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ঢাকা: আজ, রোববার সকাল (৮ ফেব্রুয়ারি) ১১টায় সিটিজেনস ফর হিউম্যান রাইটস- এর উদ্যোগে “সরেজমিন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সকল প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সম-নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে” ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাগর রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সরেজমিন পর্যবেক্ষক দলের সদস্য সতেজ চাকমার সঞ্চালনায়, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ অভিজ্ঞতার আলোকে মূল বক্তব্য উত্থাপন করেন নাগরিক প্রতিনিধি দলের সদস্য নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। উপস্থিত ছিলেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ দলের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা প্রমুখ। এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং ব্লাস্টের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরের পরও বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক ও মানবিক হতে না পারার কারণে আমরা পরিলক্ষিত করছি যে, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নানাভাবে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। তাঁরা ক্রমাগত রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ছেন ।

অন্যদিকে ধর্মীয় ও মৌলবাদী একটি চক্র সংখ্যালঘু নাগরিকদের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে- প্রত্যেকটি জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বা পরে সংখ্যালঘু জনপদের নাগরিকদের আতঙ্ক, ভয় যেন আজ চরম সত্যে পরিণত হচ্ছে। এই সত্য একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মৌলচেতনা এবং অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক ও সকল নাগরিকের বাংলাদেশ নির্মাণের লড়াইয়ের আকাঙ্ক্ষার সাথে প্রতারণা।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বিশেষ করে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের উপর বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামের রাউজানে গত ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে কমপক্ষে ১২ টি সনাতন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাহির থেকে তালা লাগিয়ে আগ্নিসংযোগের মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এ পরিবারগুলোর সকলকে পুড়িয়ে মারাই ছিল অগ্নিসংযোগকারীদের উদ্দেশ্য।

এছাড়াও মিরসরাইয়ে ৭ টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এসব ঘটনাবলী সরেজমিন পর্যবেক্ষণের জন্য সিটিজেনস্ ফর হিউমেন রাইটস্ এর একটি প্রতিনিধি দল গত ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২৬, চট্টগ্রামের রাউজান এবং মিরসরাইয়ের আক্রান্ত এলাকায় যান। সেসব পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সকল প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সম-নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার নিমিত্তে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানানোর জন্য আজকের সংবাদ সম্মেলন।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও সামগ্রিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পূর্বে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর এমন সহিংসতা ঘটনোর মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন স্থানে আতংক ছড়িয়ে দিয়ে সংখ্যালঘুদেরকে ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত রাখা। আমরা দেখেছি, রাউজান ও মিরসরাইয়ে সংঘটিত সহিংসতাগুলো ঠেকানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও কার্যকরী কোনো আইনী ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিয়ে সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি বিঘ্নিত হচ্ছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, অন্তবর্তীকালীন সরকারে সবচেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। বাংলাদেশ সংবিধান রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম কিন্তু পাশাপাশি অন্য সকল ধর্মের নিরাপত্তার বিধান রয়েছে আজকে তারা সেই নিরাপত্তা পাচ্ছে না। মুসলিম ছাড়া বাকি জনগোষ্ঠীদের এদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে এদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাদের উপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংঘটিত করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ধর্মের দেশ। সেই বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য ১৯৭১ সালে সাম্য ও মানবিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাকে সাথে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। আজকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত করার চেষ্টা কখনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে পড়ে না। বাংলাদেশ একটি বহু বৈচিত্র্যপূর্ণ রাষ্ট্র, আগামীতে যে সরকার আসবে অবশ্যই এই জাতিগত বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিতে হবে বলে দাবি জানান।

শানসুল হুদা বলেন, সংখ্যালঘুদের উপর সংঘটিত বেশিরভাগ সহিংসতার পেছনে নানান উদ্দেশ্য থাকে, পরিকল্পিত ভাবে এগুলো সংঘটিত করা হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী,আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা আজকে জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা যাতে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে সে পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য তিনি নির্বাচন কমিশনারের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি আরো বলেন, বৈষম্য বিরোধী চেতনা নিয়ে যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে দেড় বছরের বেশি সময়েও বৈষম্য নিরসনের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাইনি। এদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের নির্বাচনে ভোট প্রদানের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থিতিশীল সমাজ দেশ গঠনে এদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরী।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিনিধি তাওহীদ আহমেদ রানা রাইজান অগ্নিসংযোগ ঘটনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর কোনো ধরনের ঘটনা সংঘটিত হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। এমনকি যারা এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা কোথায় থাকবেন, কী খাবেন সেটিও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালনা করার সময় বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সরেজমিন পর্যবেক্ষক দলের সদস্য সতেজ চাকমা বলেন, দেশের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে বাংলাদেশে এই নাগরিকরা আরো প্রান্তিকতার দিকে ধাবিত হবেন এবং তাঁদের উপর চলা নিপীড়ন ও বৈষম্য আরো বৃদ্ধি পাবে। সব নাগরিকের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি-নির্ধারণের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এগিয়ে নিতে হলে সকল নাগরিকের মতামতকে সম্মান জানিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অপরাপর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বিঘ্নে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার লক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে সংবাদ সম্মেলনে নিম্নােক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হয়-

১. ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে বিশেষ কার্যকরী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা এবং এ বিষয়টি নিয়মিত তদারকির জন্য উচ্চ-পর্যায়ের একটি বিশেষ কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সেল গঠন করা;
২. রাউজান ও মিরসরাইসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সংখ্যালঘুদের উপর সংঘটিত সকল ধরণের সহিংসতার তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা;
৩. ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ পূর্বক ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা;
৪. ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মানসিক আঘাত দূরীকরণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা; এবং
৫. নবগঠিত মানবাধিকার কমিশনের কাছে আমাদের আহ্বান- কমিশন যাতে এ বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারিতে রাখেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

সেইসাথে সংবাদ সম্মেলন থেকে নির্বাচনমুখী সকল রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এবং নির্বাচন পরবর্তী নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য উদাত্ত আহ্বানও জানানো হয়।

More From Author