হিল ভয়েস, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি অন্তর্বতীকালীন সরকারের আমলে জারীকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮ টি অপরিবর্তিতভাবে সংসদে পাস করার সুপারিশ করেছে। কিন্তু মৌলিক সংস্কার এবং অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদানকারী গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ রহিতকরণ এবং কিছু অধ্যাদেশ পরবর্তীতে সংশোধিত আকারে সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করার সুপারিশ করেছে।
সাধারণ জনগণ এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, এই অধ্যাদেশগুলো জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস করার দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু গত ৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখ জাতীয় সংসদে মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ) বিল, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক (রহিতকরণ) বিল পাসের মাধ্যমে দেশের জনগণের আকাংখাকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখানোর প্রেক্ষিতে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে ৩১ জন নাগরিক আজ নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রদান করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, “ জুলাই গণঅভুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্তর্বতীকালীন সরকার সংস্কার, মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সরকারের সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অনেকগুলি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তৎকালীন সময়ে সকল রাজনৈতিক দলসমূহ এ বিষয়গুলোকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তা জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস হতে হবে। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে এ সকল অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য সরকারি ও রিরোধীদলের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি ৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ এবং ১৬টি অধ্যাদেশকে অধিকতর পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে। যদিও বিরোধী দলসহ কয়েকজন সদস্য এ বিষয়ে নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কমিটির সুপারিশ অনুসারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশের মতো মৌলিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধিনতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিতকরনের সঙ্গে সম্পর্কিত অধ্যাদেশগুলো রহিতকরনের সুপারিশ অনুসারে গত ৯ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখ জাতীয় সংসদে মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ) বিল, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক (রহিতকরণ) বিল জনগণের দাবিকে উপেক্ষা করে এবং বিরোধীদলের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। যা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও তাদের বার বার উচ্চারিত অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এছাড়াও তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশগুলোকে অধিকতর যাচাই-বাছাই এর সুপারিশ করেছে কমিটি যা মোটেই কাম্য ছিল না।
এর ফলে বিচারের বিভাগের স্বাধীনতা যেমন ক্ষুন্ন হবে তেমনি অধ:স্তন আদালত পুনরায় শাসন বিভাগ তথা সরকার দলীয় প্রভাব বিস্তারের পূর্বতন রেওয়াজ ফিরিয়ে আনার অবস্থায় চলে যাবে। মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি অতীতের সরকার দিয়ে আসলেও তা যথাযথ বাস্তবায়ন করেনি। বর্তমান মানবাধিকার কমিশন আইনটি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে সংশোধন জরুরি ছিল। অধ্যাদেশটি পাস হলে তা সম্ভব হবে বলে জনমনে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে ভুক্তভোগীরা যথাযথভাবে প্রতিকার পেতে পারত এবং মানবাধিকার লংঘনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু তা না হওয়ায় পূর্বের মতোই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি অকার্যকর, আমলাতান্ত্রিক কিংবা দলীয় অনুগত লোকদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবার আশংকা আরো প্রবল হলো। বলা বাহুল্য এ সকল সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলো আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল এবং তা আমাদের দেশের ভাবমুর্তি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথেষ্ট উজ্জ্বল করেছিল, এখন ঐ সব প্রতিষ্ঠান সরকারী নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টার অংশ হিসেবে এসকল অধ্যাদেশ গ্রহণ না করে বর্তমান সরকারও অতীতের সরকারগুলির মতো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সরকার হিসেবে বিবেচিত হবে, এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। উল্লেখ্য, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ প্রনয়ণের প্রক্রিয়ায় বর্তমান আইনমন্ত্রী তৎকালীন এটর্ণী জেনারেল হিসেবে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাই সরকারের এ বিষয়ে আপত্তি থাকার বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর। তাছাড়া সরকারি দল তার নির্বাচনী ইশতেহারে সুপ্রীম র্ক্টো সচিবালয় কার্যকর করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মনে রাখা দরকার, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনটি কোন সাধারণ নির্বাচন ছিল না। এই নির্বাচন হয়েছে ১৫ বছরের দু:শাসনের অবসানের পটভূমিতে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের প্রতিশ্রুতিপূর্ণ গণঅভুত্থানের সফল পরিনতি হিসাবে। তাই সরকারের ম্যান্ডেট ও অঙ্গীকার কোন সাধারণ অঙ্গীকার নয়। সরকার, সকল রাজনৈতিক দলসহ সবারই তাকে সম্মান করার দায় আছে।
বাংলাদেশ গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন The International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance (ICPPED) এ অনুস্বাক্ষর করেছে। তাই গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশটি পাস করা সরকারের বাধ্যবাধকতার একটি অংশ। নচেৎ আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণ জনগণের তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যা অন্তবর্তী সরকার অধিকতর কার্যকর করার লক্ষ্যে সংশোধন করেছে মাত্র। তাই এ সকল অধ্যাদেশ সমূহকে সম্পূর্ণ রূপে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আইনে রূপান্তরের জন্য আগের অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এখনই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করতে চাই সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুত নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর থাকবে, এবং সংসদে আইন পাসের ক্ষেত্রে তার প্রমান তারা দেবেন। অন্যথায় জনগন আবারো প্রতিবাদে সোচ্চার ও সক্রিয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে এতে কোন সন্দেহ নাই।”
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন-
১. আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদ, সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
৩. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
৪. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি
৫. রাশেদা কে. চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
৬. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সভাপতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র
৭. শিরীন পারভিন হক, সদস্য, নারীপক্ষ
৮.শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
৯. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
১০. ড. গীতি আরা নাসরিন, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১১. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নাট্যকর্মী
১২. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৩. ড. শাহনাজ হুদা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৪. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৫. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৬. ড. স্বপন আদনান, ভিজিটিং প্রফেসর, লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এবং পলিটিকাল সাইন্স
১৭. ড. ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
১৮. ড. নোভা আহমেদ, অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
১৯. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
২০. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
২১. মনিন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ
২২. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২৩. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বি এন ডব্লিউ এল এ
২৪. রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট
২৫. শাহ ই মবিন জিননাহ, নির্বাহী পরিচালক, সিডিএ
২৬. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
২৭. ঈশিতা দস্তিদার, লেখক ও গবেষক
২৮. রোজিনা বেগম, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী
২৯. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী
৩০. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী
৩১. হানা শামস আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা।
+ There are no comments
Add yours