হিল ভয়েস, ৮ মার্চ ২০২৬, নিজস্ব প্রতিবেদক: গত শুক্রবার (৬ মার্চ) বিকাল ২ ঘটিকার সময়ে ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শিল্পগ্রাম এনইজেডসিসি অডিটোরিয়ামে ‘Identity, Student Leadership, Inclusive Development and Democratic Dialogue’ স্লোগানকে সামনে রেখে অল ইন্ডিয়া চাকমা স্টুডেন্ট ইউনিয়ন (এআইসিএসইউ)’র উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলন শুরু হয়। এতে প্রথম দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করা এবং আঞ্চলিক ও জাতীয় নিরাপত্তা’র উপর এর প্রভাব’ শীর্ষক এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনের এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন, অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো ড. অনুরাগ চাকমা, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ স্কলার নরেশ চাকমা, সিনিয়র সাংবাদিক নব ঠাকুরিয়া, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট ড. অঙ্কিতা দত্ত, গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কুলদীপ বৈশ্য প্রমুখ।
উক্ত সম্মেলনে সঞ্চালনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ড. শ্যামল বিকাশ চাকমা।
এই সময় নরেশ চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪ জাতিগোষ্ঠী ভিন্ন ভাষাভাষি জনগোষ্ঠী ‘জুম্ম’ নামে অধিক পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদের পাশাপাশি স্থায়ী বাঙালি সম্প্রদায়েরও বসবাস। যেখানে ব্রিটিশ সময়কালে চাকমা রাজারা সমতল থেকে পাহাড়ে জমিতে চাষবাসের উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা হয়। সেই সময় ১৯০০ সালের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি’ জুম্মদের ভূমি এবং কোনো প্রকার বাঙালির অবৈধভাবে বসবাসের সুযোগ থেকে রক্ষা করে। এই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ‘Excluded Area’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান সময়কালে এখানকার জনসংখ্যা ছিল আদিবাসী ৯৮% এবং বাঙালি ছিল ২%। অপরদিকে স্বাধীন বাংলাদেশ সময়কালে বিশেষত বিএনপি নেতৃত্বাধীন মেজর জিয়াউর রহমানের আমলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সেটেলার বাঙালি পুর্নবাসন করেন। যার কারণে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার বাঙালিরা জনসংখ্যাগতভাবে এগিয়ে গেছে এবং জুম্মরা দিনদিন সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে।
নরেশ চাকমা আরো বলেন, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু বিগত ২৮ বছর ধরে চুক্তির কিছু ধারা এবং উপধারা বাস্তবায়িত হলেও এখনও দুই-তৃতীয়াংশ ধারা অবাস্তবায়িত। বিশেষ করে চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে জুম্মদের মালিকানাধীন কমপক্ষে তিনশ একর জমি অবৈধভাবে বাইরের বেশ কয়েকটি কোম্পানি, প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তি এবং বসতি স্থাপনকারী দ্বারা দখল করা হয়েছিল। ম্রো আদিবাসী ৩০ জনের অধিক শিশুকে বিনামূল্যে শিক্ষা এবং চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের নামে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। বেশিরভাগ মানবাধিকার লঙ্ঘন জমি বিরোধের কারণে ঘটে। উদাহরণস্বরূপ- ১৮, ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটিতে একটি হামলা ঘটে এবং চারজন নিহত হয়। ১৪২ বাড়ি এবং দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৫-১৬ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ঢাকায় সেটেলার বাঙালি একটি দল কর্তৃক আদিবাসী ও মানবাধিকার কর্মীদের উপর আক্রমণ করা হয় এবং সেখানে আঠারো জন গুরুতর আহত হয়। ২৭-২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে গুইমারার রামসু বাজারে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক তিনজনকে হত্যা করে এবং ৫৪টি দোকান, ২৪টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ২০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে বাঘাইছড়ি উপজেলার বড়মাইল গ্রামে সেটেলার বাঙালি বাঙালি কর্তৃক ১০টি বাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং একটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
নরেশ চাকমা আরো বলেন, বর্তমানে ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশেই আমরা আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রক্ষা এবং প্রচারের মতো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি। তাই আমাদের পরিচয় সংরক্ষণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া উচিত। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ভারত হোক বা বাংলাদেশ চাকমা সম্প্রদায় হিসেবে আমরা এই বিষয়গুলিতে কোনও ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন সহ্য করব না। ছাত্র এবং যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাদের আওয়াজ তুলতে হবে। একইভাবে আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তি গ্রহণ করে আমাদের বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানে শিক্ষিত এবং দক্ষ হয়ে উঠতে হবে।
অনুরাগ চাকমা বলেন, ১৯৯৭ সালের এই চুক্তিকে প্রায়ই একটি ব্যর্থ চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে পুরোপুরি ব্যর্থ বা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত-এমন কোনো অবস্থায় নয়; বরং এটিকে আংশিক বাস্তবায়িত করা হয়েছে। তার কারণ সরকারের দুর্বল রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী আসলে একটি জাতি-রাষ্ট্র মডেল অনুসরণ করতে চায়। যাতে আদিবাসী সম্প্রদায়গুলিকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। এর অর্থ হল যতক্ষণ না সরকারের রাষ্ট্রীয় আত্তীকরণ নীতি পরিবর্তন না করা হবে, ততক্ষণ আমরা এই চুক্তির বাস্তবায়ন আশা করতে পারি না। আমরা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক প্রকৌশল বন্ধ হওয়ার আশা করতে পারি না।
ড. অঙ্কিতা দত্ত বলেন, যারা উগ্র মৌলবাদে বিশ্বাসী তারা কোনো সমাজেই শান্তি বজায় রাখতে পারে না; বরং তারা যেখানেই যায় সেখানেই গন্ডগোল ও অশান্তি তৈরি করে। পার্বত্য চট্টগ্রামেও এই উগ্রবাদী গোষ্ঠী একই ধারা বজায় রেখেছে। তিনি অভিযোগ করেন যে, একটি নির্দিষ্ট উগ্র মানসিকতার কারণে এই অঞ্চলের আদিবাসীদের সাথে ক্রমাগত সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে এবং এই গোষ্ঠী স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে যেতেও চরমভাবে অনীহা প্রকাশ করে। তিনি বিশেষভাবে বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বৌদ্ধ নারীদের ওপর চলমান ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন।
তিনি আরো বলেন, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সুপরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু নারীদের টার্গেট করছে। তিনি ১৬ বছর বয়সী এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরী ধর্ষণের উদাহরণ দিয়ে জানান যে, প্রশাসন ও পুলিশ অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে মামলা তুলে নিতে নিয়মিত চাপ দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের দায়মুক্তির এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, দুর্বল চার্জশিট এবং অপরাধীদের দ্রুত জামিন পাওয়ার ফলে দোষীরা কোনো শাস্তি পায় না। এটি আদিবাসী চাকমা সমাজকে চরম নিরাপত্তহীনতা এবং অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’র পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। স্থানীয় আদিবাসী কাউন্সিলগুলোর কাছে যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় চাকমারা তাদের পৈতৃক ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ভূমি বিরোধ দিন দিন জটিলতর হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিরসনে তিনি আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ এবং বাংলাদেশ সরকারকে ১৯৯৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য অঞ্চল থেকে অসামরিকায়ন নিশ্চিত করা ও আদিবাসীদের স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়ার জোর আহ্বান জানান।
অ্যাডভোকেট কুলদীপ বৈশ্য বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যা ঘটছে তা কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত আগ্রাসন’। আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ভুলে বেঁচে থাকা কোনো মর্যাদাপূর্ণ জীবন হতে পারে না।
তিনি আরো বলেন, ১৯৯৭ সালের চুক্তি এটি কেবল কাগজের কোনো দলিল বা আইন নয়; এর সফলতার জন্য প্রয়োজন ‘টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা’। চুক্তিটি হওয়ার প্রায় ২৮ বছর পার হয়ে গেলেও এর বাস্তবায়ন না হওয়াকে তিনি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখিয়েছেন। এই সংকট নিরসনে সকল সম্প্রদায়সহ সমস্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের একক কণ্ঠে কথা বলতে হবে। যদি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংহতি প্রকাশ করে, তবেই বিশ্ব দরবারে তাদের দাবি জোরালোভাবে পৌঁছানো সম্ভব হবে এবং এই অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসবে।
নব ঠাকুরিয়া বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির সঠিক চিত্র অনেক সময় মূলধারার সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা সংবাদকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীদের নৈতিক দায়িত্ব। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের ঐতিহাসিক বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বর্তমানেও সেখানে আদিবাসীরা এক ধরনের ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ।
তিনি আরো বলেন , চুক্তির আইন অনুযায়ী পার্বত্য তিন জেলা পরিষদে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে জেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয় উল্লেখ থাকলেও আজ অবধি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এই দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি’র পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়াকে তিনি এই অঞ্চলের অশান্তির অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখনও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এছাড়াও তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের এই মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং তদারকির আহ্বান জানান।