ইউপিডিএফ নেতা মিল্টন চাকমার ‘কেমন ছিল শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম’ প্রসঙ্গে

রবি ত্রিপুরা

ইউপিডিএফের নিজস্ব ফেইসবুক পেইজে মধ্যম সারির নেতা মিল্টন চাকমার একটি লেখা প্রচারিত হয়েছে। লেখাটি আমার নজরে এসেছে। লেখায় জেএসএসের আন্দোলন নিয়ে ফেইক ন্যারেটিভ হাজির করে বরাবরের মতন জননন্দিত নেতা সন্তু লারমাকে বির্তকিত করার একটা হীন প্রয়াস করা হয়েছে। লেখাটি অত্যন্ত মনগড়া, মিথ্যা ও রাজনৈতিক ফায়দা লুটার একটি অপচেষ্টা মাত্র।

আলোচনা শুরু করার আগে মিল্টন বাবু তথা প্রসিত গংদের দায়িত্বশীল কীর্তির উপর সওয়াল না উঠালে নয়। মিল্টন চাকমা ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতা ছিলেন। প্রসিত খীসা ছিলেন তার আদর্শিক গুরু। মিল্টন চাকমার জানা উচিত যে, তৎকালীন সময়ে পার্টির নেতৃত্ব শক্তিশালী ও সশস্ত্র আন্দোলন জোরদারকরণে জেএসএস’এর নেতৃত্ব ১৯৯৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ও পাহাড়ী গণপরিষদ (পিজিপি) থেকে সদস্য রিক্রুট করার জন্য একটি আহবান জানান। পিসিপি ও পিজিপির নেতৃত্ব এবং পিসিপির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে না জানিয়ে বা আলোচনা না করে প্রসিত বিকাশ খীসা ও সঞ্চয় চাকমা মিলে ১০০ জনের কর্মী বাহিনীর নামের তালিকা পার্টির নিকট প্রেরণ করে। নেতৃদ্বয়ের কাছ থেকে তালিকা পেয়ে পার্টির নেতৃত্ব পিসিপি ও পিজিপির কর্মীদের গুরুত্ব দিয়ে আলাদা ঘরবাড়ি প্রস্তুত করে রাখে। পিসিপি ও পিজিপির কর্মী বাহিনীর জন্য পার্টির নেতৃত্ব অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার করে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কালায়ন চাকমা ও বর্তমানে র‌্যাবে চাকরিরত প্রিয়দর্শী চাকমাসহ ১০-১৫ জনের একটি টিম নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়। তৎকালীন সময়ে সশস্ত্র আন্দোলনে সামিল হওয়া একজনের সাথে আলাপ করে জানা যায়, যেদিন তারা গন্তব্যের পথে হাঁটছিলেন সেদিন ইউপিডিএফের বর্তমান সশস্ত্র বিভাগের প্রধান সচিব চাকমার সাথে তার দেখা হয়। তিনি সচিব চাকমাকে মামা বলে ডাকতেন। সচিব চাকমাকে তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন মামা যাবেন না? জবাবে সচিব চাকমা বলেছিল, তোমরা যাও, আমরা পরে আসতেছি। সশস্ত্র আন্দোলনে যাওয়ার প্রতিশ্রতি ভঙ্গ করে প্রসিত খীসা, সচিব চাকমা, রবি শংকর গং পিসিপির গঠনতন্ত্রের ১৯নং ধারার (চ) উপধারা লঙ্ঘন করে ২ বছর পর ১৯৯৭ সালের ১০ মার্চ ঢাকায় মিছিল করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কথিত পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবিটি হাজির করে। মূলত আলাদা দল করার লক্ষ্যে প্রসীত খীসারা সেদিন পার্টির আন্দোলনে সামিল হননি।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, খাগড়াছড়ি জেলা শাখার কাউন্সিলে ৭টি প্রস্তাবনা গৃহীত হয়। প্রথম দুইটি প্রস্তাবনা হচ্ছে-(১) জেলা পরিষদ বাতিল পূর্বক সাংবিধানিক গ্যারান্টিসহ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে হবে ও (২) পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিরসনকল্পে অচিরেই জনসংহতি সমিতির সাথে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে (দেখুন: স্যাটেলাইট ম্যাগাজিন, ১ম বর্ষ, ১ম প্রকাশনা, ৬ই অক্টোবর ১৯৯২)। উক্ত কাউন্সিল অধিবেশনে পিসিপি’র তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রসিত খীসা ও সাধারণ সম্পাদক করুণাময় চাকমা উপন্থিত ছিলেন। বলাবাহুল্য, প্রস্তাবাবলী সাধারণত কাউন্সিল অধিবেশনে প্রতিনিধিদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে গৃহীত হয়ে থাকে।

এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। লেখার দ্বিতীয় সারিতে মিল্টন চাকমা বলেছেন, “……বাংলাদেশ সরকার শান্তিবাহিনীর হামলা মোকাবিলার জন্য সমতল জেলা থেকে বাঙালি মুসলমান পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এবার শান্তিবাহিনী সরকারের এই সেটেলার পুনর্বাসন কর্মসূচি বানচাল করে দিতে তাদের ওপর হামলা শুরু করে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জিয়াউর রহমান বুদ্ধি করে সন্তু লারমাকে গোপন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে মুক্তি দেয়।”

মিল্টন চাকমা কতৃর্ক সন্তু লারমার মুক্তির সাথে সেটেলার পুনর্বাসনের বিষয়টির যোগসূত্রের বয়ান ডাহা মিথ্যা। তিনি দলীয় বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য সম্মতি উৎপাদন হিসেবে মূলত মহিউদ্দিন আহমেদের বই ও লারমার হত্যাকারী বিভেদপন্থী নেতা প্রীতি কুমার চাকমা (প্রকাশ) এর দায় মোচনের লেখার রেফারেন্স টেনেছেন। রাজনীতিতে আটক ও মুক্তিলাভ একটি সাধারণ বিষয়। সন্তু লারমার মুক্তির পর সেটেলারদের উপর হামলা কমানোর বক্তব্য যুক্তিহীন ও মিথ্যা।

শ্রী লারমা ১৯৮০ সালের ২৩ জানুয়ারি মুক্তিলাভ করেন। সরকারের সাথে ডায়লগের প্রস্তাবনা আসে ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উপেন্দ্র লাল চাকমার মারফতে। সন্তু লারমা জেলে থাকায় শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা রাজনৈতিক এবং তথ্য ও প্রচার বিষয়ক সম্পাদক শ্রী গৌতম কুমার চাকমাকে প্রধান করে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি আলোচনা ও যোগাযোগ কমিটি গঠন করে দেন। উপেন্দ্র লাল চাকমা সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিনা পার্টির তরফ থেকে জানতে চাওয়া হলে সরকার লিখিতভাবে জানাতে অস্বীকার করে। তখন পার্টি বুঝে নেয় সেটেলার পুনর্বাসন কার্যক্রম আড়াল করার জন্য সরকার আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিল। পার্টি সেটেলার পুনর্বাসন সশস্ত্রভাবে মোকাবেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সশস্ত্র প্রতিরোধের কারণে সেটেলার পুনর্বাসন কার্যক্রম থমকে যায়। বিশেষ করে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ফেনী উপত্যকায় মাটিরাঙ্গা, রামগড় ও মানিকছড়ি থানা এলাকায় ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে সেনাবাহিনী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং হাজারে হাজারে সেটেলার স্ব স্ব জেলায় প্রত্যাবর্তন করে (পড়ুন: জনসংহতি সমিতির গৃহযুদ্ধ ও তারপর/ শ্রী গৌতম কুমার চাকমা) বিভেদপন্থীদের গুণগান গেয়ে মিল্টন চাকমার যে বয়ান তা বাংলাদেশের ডানপন্থী ও মৌলবাদী জামায়াতির বয়ানের অনুরূপ। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি রাজাকারের নামটা শুনতে পারে না, ইউপিডিএফ’র কাছে বিভেদপন্থীদের নাম বেশ জনপ্রিয়। ইউপিডিএফের সাবেক ফিল্ড কমান্ডার আনন্দ প্রকাশ একজন বিভেদপন্থী। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে সামিল হয়ে ক্ষমতার লোভে দ্রুত নিষ্পত্তি করার সস্তা স্লোগান তুলে যারা মহান নেতাকে হত্যা করে আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে, জুম্ম জনগণ যাদের ঘৃণা করে, নিন্দা করে, কিন্তু মিল্টন বাবুর ইউপিডিএফ তাদের গুণগান করে। এম এন লারমার হত্যাকারী হিসেবে ইউপিডিএফ কখনো তাদের নিন্দা করে না। উপদলীয় গ্রুপ ম্রোদের উপর হামলা চালিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি করেছিল ইউপিডিএফ তা মুখে আনে না।

১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সরকার প্রথম ধাপে দেড় লক্ষাধিক বাঙালি সেটেলারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তর করে। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধের ফলে হাজার হাজার সেটেলার প্রাণের ভয়ে সমতলে ফেরত যায়। দ্বিতীয় ধাপে, সরকার ১৯৮২ খ্রীস্টাব্দে ৮৭,০০০ পরিবার স্থানান্তর করে। তৃতীয় ধাপে ১৯৮৩ সালে জুলাই মাসে সরকার ২৫০,০০০ সেটেলার পুনর্বাসন করে। চতুর্থ ধাপে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৭৫,০০০ সেটেলার পুনর্বাসন করে। মোট চারটি ধাপে সরকার পাঁচ লক্ষাধিক সেটেলার পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তর করে। প্রথম ধাপে সেটেলার পুনর্বাসন যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে সেটেলার পুনর্বাসনের সময় তেমন প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি। উক্ত সময়ে গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশের নেতৃত্বে পার্টিতে উপদলীয় চক্রান্ত শুরু হয় এবং সরকারকে সেটেলার পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়। ফলে পার্টিকে উপদলীয় চক্রান্তের সমস্যা সমাধানের দিকে বেশি মনোনিবেশ করতে হয়, যার সুযোগ সরকার লুফে নিয়ে বিনা বাধাঁয় পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার পুনর্বাসন করে। পার্টির আক্রমণে দিশেহারা হয়ে উপদলীয় গ্রুপটি ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৯ এপ্রিল সেনা কর্তৃপক্ষের সাথে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির ভিত্তিতে রাঙ্গামাটি স্টেডিয়ামে তৎসময়কার ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল নুরুদ্দিন খানের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্রশস্ত্র জমা দেয়। সরকার বা সেনা কর্তৃপক্ষ কিছু সংখ্যক নেতা বা কর্মীকে চাকুরীতে নিয়াগে প্রদান করে ও কিছু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেয়। তবে উক্ত চুক্তির অন্য কোনো দফা যেমন-জায়গা-জমি বেদখল ও বাঙালি সেটেলারদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি প্রদান বন্ধ করা ইত্যাদি সরকার পূরণ করেনি। ফলে পাহাড়ে সেটেলার পুনর্বাসনের দায় সন্তু লারমার উপর চাপিয়ে দিয়ে মিল্টন বাবুর বক্তব্য বাস্তবিক অর্থে চরম মিথ্যাচার অথবা অজ্ঞতাপ্রসুত বলে বিবেচনা করা যায়।

তিন বছরের উপদলীয় চক্রান্ত শেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নতুন করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ক্ষমা করা ও ভুলে যাওয়া নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বিভেদপন্থীদের মধ্যেকার দেশপ্রেমিক অংশকে পার্টিতে সামিল হওয়ার আহবান জানানো হয়। নতুন করে গণসংগঠন ও পার্টি সংগঠন পুনর্গঠিত করতে থাকে। ১৯৮৫ সালের ১লা নভেম্বর পার্টির কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ খ্রীস্টাব্দে ২৯ এপ্রিল নতুন করে পার্টি সেনাক্যাম্প ও সেটেলারদের উপর সুসংগঠিত আক্রমণ শুরু করে। বহু সেনা সদস্য ও প্রায় দেড় লক্ষাধিক সেটেলার সমতলে ফেরত চলে যায় (পড়ুন: পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে, সৈয়দ আবু রায়হান; পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির গৃহযুদ্ধ ও তারপর, গৌতম কুমার চাকমা)। সুতরাং মিল্টন চাকমার উত্থাপিত বক্তব্য বাস্তবতা বিবর্জিত।

জেএসএসের সশস্ত্র আন্দোলনকে সেটেলার পুনর্বাসনের সাথে দৈবযোগ ঘটানোর মিল্টন চাকমার বক্তব্য বাস্তবতার সাথে আদৌ কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার পুনর্বাসনের ইতিহাসের উপর প্রসিত গ্রুপের নেতা মিল্টন চাকমার যথাযথ জ্ঞান নেই। সশস্ত্র যুদ্ধ নয়, অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করার জন্য সমতল থেকে সেটেলার পুনর্বাসন যে আসল কারণ তা মিল্টন চাকমা বুঝতে অক্ষম। সশস্ত্র যুদ্ধ ছিলো শাসকগোষ্ঠীর জাতিগত আগ্রাসন ও সেটেলার পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মাত্র। মিল্টন চাকমাকে ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে চাই, পাকিস্তান সরকার ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি লঙ্ঘন করে ১৯৫০ দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের লংগদু এবং নান্যাচরে সেটেলার বসতি স্থাপন করে। এবং এটি ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পাশাপশি পাকিস্তান সরকার জুম্ম জনগণের জমি দখলের জন্য সিএইচটি (ভূমি অধিগ্রহণ) প্রবিধান, ১৯৫৮ প্রণয়ন করেছিল। তদুপরি, সরকার ১৯৬৩ সালে “উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা” মর্যাদা বাতিল করে জুম্ম জনগণের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেয়। অধিকন্তু, সরকার ১৯৬১ সালে এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবিধানের ৩৪ ধারা সংশোধন করে বহিরাগত বাঙালি মুসলমান বসতি স্থাপনকারীদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল উন্মুক্ত করে দেয়। এটি প্রাসঙ্গিক যে, প্রবিধানের ৩৪ ধারা জুম্ম জনগণের জন্য একটি সুরক্ষা হিসেবে ছিল, যা পার্বত্য চট্টগ্রামে জমির মালিকানা এবং অ-আদিবাসীদের স্থানান্তর নিষিদ্ধ করেছিল।

মিল্টন চাকমা তার লেখায় জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত না করে এবং যথাযথ প্রস্তুতি না নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করা ছিল জেএসএসের একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল ও অপরিণামদর্শী বলে উল্লেখ করেছেন।

সংগ্রামের নীতি ও কৌশল নির্ধারিত হয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় তথা জাতীয় জীবনের সার্বিক বাস্তবতার নিরিখে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতার নিরিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি উভয় নীতি কৌশলকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। জেএসএস গঠনের পূর্বে যেমন জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে জাগানো হয়েছিল, জেএসএস গঠনের পর জনগণের মাঝে জুম্ম জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক চেতনা যথেষ্ট পরিমাণে জাগরিত হয়েছিল। সারাক্ষণ জেএসএস বিরোধী ভূতের মাথা নিয়ে থাকা মিল্টন বাবু ভুলে গেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে প্রয়াত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৬২ সালের চট্টগ্রামের বান্ডেল রোডের পাহাড়ি ছাত্রাবাসে পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনের ঐতিহাসিক, “শিক্ষা গ্রহণ কর, গ্রামে ফিরে চলো, জুম্ম জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন কর এবং ঘুণেধরা সামন্তীয় সমাজের উপর আঘাত কর” স্লোগানের কথা মিল্টন বাবুকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। সেই স্লোগানকে সমুন্নত রেখে পাহাড়ী ছাত্র সমিতির নেতৃবৃন্দ সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সাংগঠনিক সফর করে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায়ের দাবিতে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক, জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা মাইসছড়ি স্কুলে প্রধান শিক্ষক এবং অমিয় সেন চাকমা ঠেগা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আরও অনেকেই পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার আড়ালে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে নিজস্ব আইন পরিষদ সম্বলিত স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক অধিকারসহ মোট ১৬ দফা দাবি জানিয়ে “নির্বাচন পরিচালনা কমিটি” প্লাটফর্মের মাধ্যমে নির্বাচনে বিপুল ভোটে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জয়লাভ জনগণের রাজনৈতিক চেতনার জাগরণের একটি বহি:প্রকাশ। ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে উত্তরাঞ্চল থেকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে চাথোয়াই রোয়াজার প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থন রাজনৈতিক সচেতনার পদচিহ্ন বহন করে।

মিল্টন বাবুকে আরও পরিষ্কার করে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ব জুম্ম জনগণকে দেশপ্রেমে ও জাতীয় সংগ্রামে উজ্জীবিত করার জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকেও হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলে। তারই অংশ হিসেবে ১৯৭৩ সালে গড়ে উঠে ‘গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী’। গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সংগ্রামে সামিল হওয়ার জন্য জনমত গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী শুধু নতুন গান, নৃত্য সৃষ্টি করেনি, পোষাকের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও আন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি করেছিল (পাহাড়ী ছাত্র সমিতি ও গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী; রণজিৎ দেওয়ান)। জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী রণজিৎ দেওয়ান, কালায়ন চাকমা, বিশ্বকীর্তি ত্রিপুরা, সাগরিকা রোয়াজা, মোহন মারমা, মুকুল মারমা ও সুগত চাকমা ননাধনের নাম উল্লেখযোগ্য। গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠীর গাওয়া “ঝিমিত ঝিমিত জুনি জ্বলে, রেত্তো জনমমো ন থেব” জুম্ম সমাজে ব্যাপক সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত করেছিল।

তাই মিল্টন বাবুর দেয়া জনগণকে আগে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত না করে এবং যথাযথ প্রস্তুতি না নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করা ছিল জেএসএসের একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল ও অপরিণামদর্শী আখ্যা দেওয়ার বক্তব্য আগাগোড়া অন্ত:সারশূন্য।

জাতিরাষ্ট্র গঠনের পর ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্বিত্ব সংরক্ষণের জন্য ঐক্যবদ্ধ করার একমাত্র রাজনৈতিক দর্শন “জুম্ম জাতীয়তবাদ” এর উন্মেষ ঘটে। পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংহতি সমিতি এর প্রবক্তা। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জাতিসমূহ আজ সমষ্টিগতভাবে জুম্ম জাতি হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। ঐতিহাসিক বিচারে জাতীয়তাবাদের উপাদান হিসেবে বাহ্যিক উপাদানগুলির চেয়ে ভাবগত উপাদানটি অপরিহার্য ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভাষাগত, ধর্মগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভাবগত ঐক্যের ভিত্তিতে ঐতিহাসিকভাবে সংগঠিত ও বিকশিত একটি জনসমষ্টি জাতীয়তাবোধে গভীরভাবে জাগরিত হতে পারে। জুম্ম জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হচ্ছে ঐতিহ্যগত বা ভাবগত ঐক্য। নির্দিষ্ট অস্তিত্ব ও আবাসভূমি রক্ষার চিন্তাচেতনা এবং অনুপ্রেরণা, অভিন্ন অর্থনৈতিক জীবনধারণ পদ্ধতি, অভিন্ন উৎপাদন প্রণালী ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা জুম্ম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশের শাসক কর্তৃক জুম্ম জনগণের দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস আলোচনা ও পর্যালোচনা করে জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের জন্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জুম্মদের আলাদা রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করেন। গণতান্ত্রিক উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা ও তার সমাধানের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির কাছে বারবার দাবিনামা পেশ করেছেন। সংবিধান প্রণয়নের সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কর্তৃক পেশকৃত যৌক্তিক দাবি বারেবারে প্রত্যাখ্যাত হয়। দেশের বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী, মধ্যপন্থী সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে তেমন কোনো সমর্থন মেলেনি। ফলে আপনা সমস্যা আপনা সমাধানের পথে হাঁটে জেএসএসের নেতৃবৃন্দ। গঠিত হয় জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা।

৪৭ এর দেশভাগের সময় পোড়া ক্ষত, কাপ্তাই বাঁধ, স্বাধীন দেশের ঊষালগ্নে পার্বত্য আদিবাসীদের উপর মুক্তিবাহিনীর কর্তৃক নির্যাতন, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের অভিযোগ, এবং রাজাকার দমনের নামে বিডিআর ও পুলিশ কর্তৃক নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ, বাংলাদেশের সংবিধানে পার্বত্যাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন চেয়ে জাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ, উত্থাপিত দাবিসমূহ বঙ্গবন্ধু কতৃর্ক প্রত্যাখ্যাত হওয়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান কতৃর্ক লারমাদের এয়ার স্ট্র্যাপিং ও বোমা ফেলে হত্যার হুমকি, এরই সাথে ১৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের অবস্থা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের পক্ষে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে সশস্ত্র আন্দোলনে রূপান্তর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। একপর্যায়ে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হয়।

চার দফা, পাঁচ দফা ও সংশোধিত পাঁচ দফার উপর আলোচনা ও সশস্ত্র প্রতিরোধের দুই যুগের পর ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। চুক্তিতে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব টিকে থাকার মতো ন্যূনতম ভিত্তি বা অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল। চুক্তিতে আইন পরিষদ সম্বলিত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার অর্জিত না হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম অধ্যূষিত অঞ্চলের মর্যাদার স্বীকৃতি ও সেই বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত বিশেষ শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন, যার উপর সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি, বন, পরিবেশ, উন্নয়নসহ ৩৩টি বিষয় অর্পিত; পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকরিতে জুম্মদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়োগ; বেদখলকৃত জুম্মদের ভূমি ফেরতদানসহ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি; শরণার্থী ও উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন; সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার; স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও বহিরাগতদের জায়গা-জমি মালিকানায় বাধা-নিষেধ; জাতীয় পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন ইত্যাদি অধিকারগুলো স্বীকৃত হয়েছে। সুতরাং চুক্তির মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের অধিকারগুলো নিহিত রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্বশাসনের অধিকারগুলো নিশ্চিত করা যায় বলে বলা যেতে পারে।

More From Author

+ There are no comments

Add yours