হিল ভয়েস, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, রাঙ্গামাটি: “বিভেদপন্থী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী সকল প্রকার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করুন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হোন” — এই স্লোগানকে সামনে রেখে রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় রাঙ্গামাটির আশিকা কনভেনশন হলে রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির উদ্যোগে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পিসিজেএসএস’র সহ-সভাপতি শ্রী ঊষাতন তালুকদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, এম এন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা, শিক্ষাবিদ শিশির চাকমা, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশিকা চাকমা এবং পিসিপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক অন্বেষ চাকমা প্রমুখ।
রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সভাপতি ডা. গঙ্গামানিক চাকমার সভাপতিত্বে ও সাংগঠনিক সম্পাদক সুনির্মল দেওয়ানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সহ-সাধারণ সম্পাদক অরুন ত্রিপুরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রী ঊষাতন তালুকদার বলেন, জুম্ম জনগণ সংখ্যায় কম হলেও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা অবিচল। তিনি সমগ্র বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা এক্সক্লুসিভ নয়, ইনক্লুসিভ হতে চাই। আমাদের অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্র ও দেশের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, জুম্ম জনগণকে জনসংহতি সমিতি মুক্তির দিশা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন তথা অধিকার প্রতিষ্ঠায় জুম্মদের লড়াই সংগ্রামে অটুট থাকতে হবে। সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আমাদেরকে লৌহকঠিন শৃঙ্খলা ও ইস্পাত কঠিন ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করতে হবে। সুপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের কাছ থেকে অধিকার আদায়ের জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে অধিকতর সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার বিকল্প নেই।
এছাড়া তিনি আরো বলেন, চুক্তি বিরোধীরা নিজেরা মহাবিপ্লবী সাজতে চায় কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নে ২৮ বছর ধরে যে প্রতিবন্ধকতা তারা সৃষ্টি করেছে তার দায় কি এড়াতে পারবে? চুক্তি স্বাক্ষরের পর পার্টিকে এক মুহূর্তও সময় দেওয়া হয়নি চুক্তি বাস্তবায়নে সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য। আন্দোলনে কারা এগত্তর চায়, কারা চায় না সেটা মুখের মিষ্টি কথায় নয়, কাজের মধ্য দিয়ে বুঝে নিতে হবে। বিভেদ সমাধানের চাবি জনগণের হাতে। যারা এগত্তর চায় না, সেটা যথাযথভাবে বুঝে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করে জুম্ম জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে হবে।
বিশেষ অতিথি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা বলেন, যুগ যুগ ধরে জুম্ম জনগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক কায়দায় শাসন-শোষণের শিকার হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, জুম্মদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে দুর্বল করতে সরকার ও শাসকগোষ্ঠী চুক্তি বিরোধী একটি পক্ষ সৃষ্টি করে জাতিকে বিভক্ত করেছে।
তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বিজয় কেতন চাকমা বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পিসিজেএসএস দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করেছে। তিনি বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে আদর্শবান ও যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে জাতির ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার আহ্বান জানান।

শিক্ষাবিদ শিশির চাকমা বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে ব্যক্তি স্বার্থে বিচ্যুতির কারণে আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি নতুন সরকারের ভূমিকাকে ঘিরে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, জুম্ম জনগণকে সুসংগঠিত করতে অঙ্গসংগঠনসমূহকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ‘অপারেশন দাবানল’ নামে পাহাড়ে এখনো সেনাশাসন অব্যাহত রয়েছে। ভূমি বেদখল, খুন, ধর্ষণসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা চলমান রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান তিনি।
আশিকা চাকমা বলেন, জুম্ম নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পার্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৭৫ সালে মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী সংগঠনের ভিত্তি গড়ে তোলা হয়। চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় ছাত্র-যুব-নারী-পুরুষ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
“প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের শক্তির সমন্বয় দরকার” বলে মন্তব্য করে ছাত্রনেতা অন্বেষ চাকমা বলেন, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে বর্তমান বাংলাদেশ শাসনামল পর্যন্ত জুম্ম জনগণ অধিকার বঞ্চনার শিকার। মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা-র নেতৃত্বে গঠিত জনসংহতি সমিতি জুম্মদের মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
তিনি বলেন, চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনো অবাস্তবায়িত। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের শক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সভায় বক্তারা সর্বসম্মতিক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃহত্তর গণআন্দোলন জোরদারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।