হিল ভয়েস, ৯ মার্চ ২০২৬, ঢাকা: বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে আজ ৯ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য লুনা নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাশেদা রওনক খান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা এবং বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য কুর্নিকোভা চাকমার সঞ্চালনায় হিল ইউমেন্স ফেডারেশন, ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি চন্দ্রিকা চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরা।
এই সময় দীপায়ন খীসা বলেন, পৃথিবীতে নারী আন্দোলনের মূল শক্তি প্রগতিশীল চিন্তা যারা করে তাদের হাত ধরে এগিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধী দলে কোনো নারী প্রতিনিধি নেই। আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যায়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এম এন লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন শান্তিবাহিনীতে নারী সদস্যরা বীরত্বের সাথে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।
তিনি আশংকা করে বলেন, বাংলাদেশে আদিবাসী নারীরা এখনও নিরাপত্তারহীনতার মধ্য থাকে, এই রাষ্ট্র আজও আদিবাসী নারীদের জন্য নিরাপদ হতে পারেনি।
মুক্তা বাড়ৈ বলেন, নারীদের অবদান সমাজে উল্লেখযোগ্য থাকলেও আজও আমরা স্বীকৃতি পাই না। বিশ্বের ইতিহাসে যত আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ২৪ এর গণঅভুত্থানেও নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। তারা শহীদও হয়েছিল। অথচ সেই নারীদের এই রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনও সুরক্ষা, নিরাপত্তা দিতে পারেনি। অন্যদিকে বম জনগোষ্ঠীর উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নির্যাতন এখনও চলমান রয়েছে। সেখানে বম নারীও রয়েছে। তারা আজও জেলে দিনাতিপাত করছে।
মেইনথিন প্রমীলা বলেন, আদিবাসী নারীরা কাঠামোগতভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বারবার। দেশে সাম্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা দেখা যায় না। পাহাড়ে আপোষহীন নেত্রী কল্পনা চাকমার হদিস আজও মেলেনি। অন্যদিকে আদিবাসী নারীরা সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার থেকে শুরু করে নানা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
লুনা নূর বলেন, আদিবাসী নারীরা আজও প্রান্তিকতা থেকেও প্রান্তিকতার মধ্যে রয়েছে। রাষ্ট্র বারবার কথায় কথায় বলে যে বৈষম্য বিলোপ, অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদের বাংলাদেশ। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি কেবল মুখের মধ্যে রয়ে গেছে। নারীদের অবদান বরাবরের মত অস্বীকার করা হয়, অন্যদিকে আদিবাসী নারীদের অবস্থা আরও নাজুক। তারা নানাভাবে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা নতুন সরকার পেয়েছি। অথচ যারা দায়িত্বের পর্যায়ে থাকে তারা আজ তা স্বীকার করে না। আমাদের এসব বিলোপের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সমতার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সকল ক্ষেত্রে প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে।
ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, পুরো বিশ্বে আদিবাসী নারীরা ভূমি কেন্দ্রিক নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী নারীরা সহিংসতার শিকার হওয়ার মূল কারণ হলো ভূমি কেন্দ্রিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সমতল অঞ্চল, সবখানে আদিবাসী নারীদের টার্গেট করা হয়। বিশেষ করে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শ্লীলতাহানি সহ নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র আজও এর একটির বিচার করতে পারেনি।
ড. রাশেদা রওনক খান তার আলোচনায় বলেন, আমরা এখনও এমন রাষ্ট্রে বসবাস করছি- যেখানে এখনও নারী অধিকার , সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে হয়। কেবল নারী নয়, রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকরাও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। একজন নারীকে ধর্ষণের পর তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যা করে টুকরো টুকরোও করে রাখা হয়। তখন বোঝা যায় নারী এখনও ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। নারীর শরীর নিছক এক মাংসপিণ্ড মাত্র। যেখানে মূলধারার নারীরা নিরাপদ নয় সেখানে প্রান্তিক নারী, আদিবাসী নারী আরো বেশী অনিরাপদ। আদিবাসী নারীদের প্রেক্ষাপট আরও বেশি শোচনীয়। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সবসময় আদিবাসী নারীদের সহিংসতার শিকার হতে হয়।
তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট গোষ্ঠীর দ্বারা আদিবাসী নারীরা বৈষম্য থেকে শুরু করে ধর্ষণের পর হত্যার সম্মুখীন হয়। কল্পনা চাকমা তার জলন্ত উদাহরণ। প্রতিবছর আমরা কল্পনা অপহরণ দিবসে কল্পনা অপহরণের বিচার দাবি করি। কিন্তু এখনো আমরা তার হদিস পাইনি। এবারও আমরা দেখলাম কেবলমাত্র ২০২৬ সালে গত দুই মাসে সারা দেশে ৭৬ জন নারী সহংসতার শিকার হয়েছেন। লজ্জার বিষয়, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এই সহিংসতা বিলোপের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। কাজেই পচন যদি মাথায় ধরলে সমস্যা। আমরা মনেকরি, একটি সাম্য সুন্দর দেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিপীড়নের, নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থভাবে কথা বলতে হবে।
সংহতি বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি কনেজ চাকমা বলেন, গোটা বিশ্ব এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরাও এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছি। ২৪ এর গণঅভ্যূত্থানে বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থার কথা বলা হলেও কিন্তু আমরা সেটা দেখতে পাইনি। তিনি আরও বলেন, ২০০১ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন উত্তরণ নামে সেখানে সেনাশাসন জারি রাখা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠাপোষকতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী এবং শিশুরা নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এছাড়াও সমতলে আদিবাসী নারীদেরকেও টার্গেট করে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।