হিল ভয়েস, ৫ মার্চ ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ লিমিটেড (AFERMB) গত শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ “Ethnic and Religious Minorities in Bangladesh: Rights, Realities, and Future Pathways” শীর্ষক এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে।
জুম প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত এ ভার্চুয়াল সিম্পোজিয়ামে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় শতাধিক গবেষক, মানবাধিকার কর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ ও কমিউনিটি নেতারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। আলোচনা অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।
সিম্পোজিয়ামের শুরু হয় সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য উপস্থাপন এবং অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিনাল কমিউনিটি ও বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারীদের স্মরণের মধ্য দিয়ে।
সিম্পোজিয়ামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক বিনা ডি’কোস্টা। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর আলোকে সংখ্যালঘু অধিকার বিশ্লেষণ করেন এবং কিভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা বারবার টার্গেট হয়েছেন ব্যাখ্যা করেন।
অধ্যাপক ডি’কোস্টা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত আইন নেই। বিদ্যমান বৈষম্যবিরোধী আইনগুলোর দুর্বল প্রয়োগ এবং লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষার অভাব সহিংসতা ও প্রান্তিকীকরণের পুনরাবৃত্তির অন্যতম কারণ বলে তিনি মত দেন। এছাড়াও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান রাষ্ট্র ও সমাজের সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণে প্রভাব ফেলেছে। জাতীয় দৈনিক ও অন্যান্য নথিভুক্ত প্রতিবেদনের আলোকে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংঘটিত হামলার ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন। অনেক ঘটনা মূলধারার গণমাধ্যমে স্থান পায় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সবশেষে তিনি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা, অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির জন্য দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় রাজনীতিকরণকে মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেন।
এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বে সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণকারীরা সক্রিয়ভাবে মতবিনিময় করেন।
সিম্পোজিয়ামের দ্বিতীয় পর্বে প্রাণবন্ত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)-এর ড. ধীমান দেব চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো ড. অনুরাগ চাকমা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী।
এই পর্বে শুরুতেই ড. ধীমান দেব চৌধুরী একটি বিশ্লেষণধর্মী ও ঐতিহাসিক তথ্যপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করেন। তিনি ১৯৪৬ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর পুনরাবৃত্তিমূলক সহিংসতার ঘটনাগুলোকে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্যে বিশ্লেষণ করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যাগত ধারাবাহিক পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন— এটি কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি এর পেছনে পরিকল্পিত নিপীড়নের উপাদান রয়েছে? তিনি সংখ্যালঘু বিষয়ক গবেষণা আরও জোরদার করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমন্বিত অ্যাডভোকেসি বৃদ্ধি, কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার ও পরিবার পুনর্মিলনের জন্য সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অতীত ও বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ঐক্য ও ধারাবাহিক আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের আট দফা দাবি বাস্তবায়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের আর্থিক সংকট, ধর্মান্তরের চাপ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার না হওয়া, সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেট বৈষম্য এবং হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণার বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু ইস্যুতে মূলধারার গণমাধ্যমের কভারেজ সীমিত এবং এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও বিশ্বাসযোগ্য মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে ড. চক্রবর্তী গণ-সহিংসতা ও ভয়ভীতির বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকার শাহবাগের সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে পেশাগত পদোন্নতির সাক্ষাৎকার চলাকালে সংঘটিত ভয়াবহ মব সংস্কৃতির ঘটনাও উল্লেখ করেন।
ড. অনুরাগ চাকমা ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁর গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পালা পরিবর্তনের সময় কিভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, সাংবিধানিক সুরক্ষা জোরদার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সমগ্র সিম্পোজিয়ামটি সমন্বয় ও কি-নোট সেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ লিমিটেড (AFERMB) এর পরিচালক ও সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধ্যাপক ড. জহর ভৌমিক। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বের সঞ্চালনায় ছিলেন সংগঠনের পরিচালক অমল দত্ত, ড. স্বপন পাল, ইঞ্জিনিয়ার দিলীপ দত্ত ও ইঞ্জিনিয়ার শর্মিষ্ঠা সাহা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বোর্ড অব ডিরেক্টরস্ এর চেয়ার ড. সমীর সরকার।
আয়োজকরা মনে করছেন এই সিম্পোজিয়াম আন্তর্জাতিক সংলাপ জোরদার, গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সুরক্ষার পক্ষে বৈশ্বিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অনুষ্ঠানের সমাপনি পর্বে সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষা ও প্রসারে ধারাবাহিক একাডেমিক সম্পৃক্ততা, জ্ঞানভিত্তিক সংলাপ এবং সম্মিলিত উদ্যোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। সংখ্যালঘু সুরক্ষায় বিদ্যমান সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক বৈষম্যবিরোধী আইন না থাকা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনার অধিকারের নিশ্চয়তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে চলমান চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সংখ্যালঘুদের ধারাবাহিক প্রান্তিকীকরণের একটি কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে কাজ করছে বলে উল্লেখ করা হয়।