লড়াই-সংগ্রাম করতে গেলে নীতি-আদর্শগত অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: ঢাকায় আদিবাসী যুব সম্মেলনে সন্তু লারমা

0
288

হিল ভয়েস, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ঢাকা: “হে তরুণ প্রাণ, তীর ধনুকে দাও শান, মুক্তির মিছিলে তুলি দ্রোহের স্লোগান” এই প্রতিপাদ্য নিয়ে গত ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৩, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের উদ্যোগে আদিবাসী যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি অনন্ত বিকাশ ধামাইয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) এবং সম্মেলনের উদ্বোধন করেন মনজুরুল আহসান খান। জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শুরু হয়।

আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র মাদল বাজিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক মনজুরুল আহসান খান।

এসময় তিনি বলেন, “ভারতবর্ষের প্রথম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম আদিবাসীরা সংগঠিত করেছিল। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আদিবাসীরা বাংলাদেশের গৌরব, অহংকার। তারা বাংলাদেশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু বাংলাদেশের আদিবাসীদের এখনো সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি। বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হলে এই আদিবাসীদেরকে সাথে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।”

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি চিরান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের নেতৃত্বে আজ সারাদেশের আদিবাসী যুব সমাজ সংগঠিত হচ্ছে। আমরা সংখ্যায় কম হতে পারি, কিন্তু আদর্শিক দৃঢ়তায় যদি আদিবাসী যুব সমাজ সংগ্রামে যুক্ত হয় তবে অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেকোন প্রতিবন্ধকতা আমরা মোকাবিলা করতে পারব।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা বলেন, লড়াই-সংগ্রাম করতে গেলে নীতি-আদর্শগত অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যথায় ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই পরিচালনা করা কঠিনতর হবে। আমাদের দেশে উপনিবেশবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সামন্তবাদ বিরোধী, আমলা-পুজিবাদ বিরোধী, সম্প্রসারণবাদ বিরোধী নানা বক্তব্য-বিবৃতি দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃত লড়াই-সংগ্রাম সেভাবে দেখা যায় না। সেভাবেই আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অধিকতর লড়াই-সংগ্রাম জোরদার করতে হলে নীতি-আদর্শগত প্রশ্নটি সবার সামনে চলে আসে। তিনি আরো বলেন, “আদিবাসী যুব সমাজের মধ্যে নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হলে উদ্দেশ্য-লক্ষ্য এবং নীতি-আদর্শগত সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবিষয়ে আদিবাসী যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। পাহাড় কিংবা সমতলে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হলে প্রগতিশীল নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নিয়ে সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা করতে হবে। শুধু সভা-সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সাধারণ মানুষের সুখে-দু:খে সহভাগী হতে হবে। এভাবেই সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হবে।”

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী যখন হচ্ছিল তখন আমরা আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। কিন্তু রাষ্ট্র আদিবাসীদের ন্যায্য দাবিকে উপেক্ষা করে আদিবাসীদের বিভিন্ন নামে সংবিধানে আখ্যায়িত করেছে যা আদিবাসীরা প্রত্যাখ্যান করেছিল। উপরন্তু, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের পরিচয় বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করার মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে।” তিনি আরো বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক যে ধারা বাংলাদেশে চলছে সেভাবে চলতে থাকলে যে দলই ক্ষমতাই আসুক না কেন, কোনো দিনও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত হবে না। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হলে সংগ্রাম ছাড়া আর বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছাত্রনেতা অলিক মৃ বলেন, বাংলাদেশে বাঙালি জনগণ ছাড়াও যে প্রায় ৫০টির অধিক নৃতাত্ত্বিক জাতির অস্তিত্ব রয়েছে তা রাষ্ট্র বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। চট্টগ্রামের রাউজানে সংগঠিত একটি ঘটনাকে পুজি করে আজ সারাদেশে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়া হচ্ছে, অথচ রাষ্ট্র নির্বিকার। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তরবঙ্গ বা সিলেট কোথাও আদিবাসীরা ভালো নেই। তিনি এসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করার দাবি জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমা বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে আজাবধি এদেশের আদিবাসীদের অস্বীকার করা হয়েছে, অবজ্ঞা করা হয়েছে, হেয় করা হয়েছে। আমরা আজ অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। জাতীয় পাঠ্যপুস্তকসমূহে আদিবাসীদের বিষয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। সেজন্য আজ সংগ্রামকে বেগবান করতে হবে। এক্ষেত্রে আদিবাসী যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নান্নু বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীন দেশে নাগরিকের মধ্যে কোন বৈষম্য থাকবে না। একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি সেই প্রত্যাশা ভুলুন্ঠিত হচ্ছে। আদিবাসীদের সকল লড়াই-সংগ্রামে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন অতীতের মতই আগামী দিনেও পাশে থাকবে।

বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সভাপতি তৌহিদুর রহমান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দীর্ঘ ২৫ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করার দ্বায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলেও আদিবাসীরা নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। সেজন্য আদিবাসী যুব সমাজকে সংগঠিত হতে হবে, লড়াই-সংগ্রাম করতে হবে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নারী বিষয়ক সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, ব্রিটিশ শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়তো পশ্চাৎপদ এলাকা ছিল, কিন্তু সেসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের এতটা দুর্দশা ছিল না যা কাপ্তাই বাঁধ হওয়ার পরবর্তীতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীতেও সেখানকার মানুষ আজ নানাভাবে বঞ্চিত। আজকে রাউজানে সংঘটিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন একটি ঘটনা আমাদের গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক হরেন্দ্রনাথ সিং বলেন, জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেই কেন জানি আদিবাসীদের উপর জুলুম-নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যায়। ২০১৬ সালে বাগদা ফার্মে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক জনগণের টাকায় কেনা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ৩ জন সাঁওতালকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এর বিচার এখনো আমরা পাইনি। আমরা বলতে পারি না এই রাষ্ট্র আদিবাসীদের। প্রতিদিনই কোনো না কোনো আদিবাসী গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। আদিবাসীদের দেশান্তরিত হতে হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড: স্নিগ্ধা রেজওয়ানা বলেন, যেই দেশে ভাষা আন্দোলন হয়েছে সেই দেশে যখন আদিবাসীদের ভাষা আমরা সংরক্ষণ করতে পারছি না, আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে দেওয়ার সুযোগ দিতে পারছি না তখন সেটা লজ্জার বিষয়। আদিবাসী দিবসকে কেন্দ্র করে অনেক টেলিভিশন চ্যানেল তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায় কিন্তু শর্ত দেয় “আদিবাসী” শব্দটি উচ্চারণ করা যাবে না। এতে করেই আমরা বুঝতে পারি রাষ্ট্র সবক্ষেত্রে কতটা নজড়দারি আরোপ করছে। এসময় তিনি আরো বলেন, “আজকে এই অনুষ্ঠান থেকে আমি দাবি জানাতে চাই, পাঠ্যপুস্তকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বিষয়ে তথ্যাবলী সন্নিবেশিত করতে হবে। তিনি পাহাড়ের নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের নেতা।”

লেখক ও সাংবাদিক নজরুল কবির বলেন, “আদিবাসীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। আমাদের প্রশ্ন সেই সব সংস্থার লোকজন যুবলীগের প্রোগ্রামে, যুবদলের প্রোগ্রামে যেতে পারেন কি না তা আমাদের জানা নেই। চাকুরিবিধি অনুযায়ী তারা কি পারেন আদিবাসীদের উপর এরকম নির্লজ্জ নজরদারি করতে? রাষ্ট্র কী করে ভুলে যেতে চায় আমাদের জাতীয় পতাকায় মিশে রয়েছে আদিবাসীদের রক্ত।”

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয়ভাগে আদিবাসী সাংস্কৃতিক কর্মীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ-সাধারণ সম্পাদক ডা: গজেন্দ্রনাথ মাহাতো, তথ্য-প্রচার সম্পাদক হিরণ মিত্র চাকমা, দপ্তর সম্পাদক নিটোল চাকমা, সাংস্কৃতিক সম্পাদক উজ্জল আজিম, দপ্তর সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরা প্রমুখ।