রুমা ও থানচিতে পরপর সেনাসৃষ্ট কেএনএফ সন্ত্রাসীদের নাটকীয় ব্যাংক ডাকাতি, অতঃপর নানা প্রশ্ন

0
984
কেএনএফ সন্ত্রাসীদের ডাকাতির পর রুমার সোনালী ব্যাংক

হিল ভয়েস, ৩ এপ্রিল ২০২৪, বিশেষ প্রতিবেদন: গতকাল (২ এপ্রিল ২০২৪) রাত আনুমানিত ৯ টার দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৃষ্ট বম পার্টি খ্যাত কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) সন্ত্রাসীরা বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় সোনালী ব্যাংকে হামলা চালিয়ে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা এবং নিরাপত্তা রক্ষীদের ১৪টি অস্ত্র ও ৪১৫ রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা ব্যাংকের রুমা শাখার ম্যানেজার নিজাম উদ্দিনকেও অপহরণ করে নিয়ে গেছে।

উক্ত ঘটনার রেশ শেষ না হতেই আজ (৩ এপ্রিল) দুপুর ১২ টার দিকে কেএনএফ সন্ত্রাসীদের আরো একটি সশস্ত্র দল বান্দরবান জেলারই থানচি উপজেলার পাশাপাশি দুটি ব্যাংক সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে হানা দিয়ে সব টাকা লুট করে নিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

রুমার সোনালী ব্যাংক ডাকাতিতে নেতৃত্বদানকারী জাওরিন লুসাই

উল্লেখ্য, মাত্র মাসখানেক আগে সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআই প্রতিনিধিসহ বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা মারমা’র নেতৃত্বাধীন শান্তি কমিটির সাথে বৈঠক করে কেএনএফ। বৈঠকে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয় কেএনএফ। বৈঠকের পর এক মাস যেতে না যেতেই সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সামনেই ব্যাংকসমূহে কেএনএফের এমন সফল ও নাটকীয় ডাকাতি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

কেএনএফ’এর এই ডাকাতির পেছনে খোদ ডিজিএফআই বা সেনাবাহিনীর যোগসাজস ও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও নানা কারণে উঠে আসছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কেএনএফ’র ক্যাপ্টেন হিসেবে পরিচিত জাওরিন লুসাই (৪২) এর নেতৃত্বে মাত্র ১৩ জনের একটি সশস্ত্র দল রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে সোনালী ব্যাংকের রুমা উপজেলা শাখায় ডাকাতি পরিচালনা করে। এই ব্যাংকের পাশেই রয়েছে রুমা উপজেলা পরিষদের কার্যালয়, রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন ও রুমা বাজার। রুমা বাজার সেনা ক্যাম্পটি ব্যাংক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে।

সূত্রটি জানায়, ঐদিনই ঘটনার (আনুমানিক রাত ৯টা) মাত্র কিছুক্ষণ পূর্বে বান্দরবান সদর থেকে গাড়িতে করে উক্ত সোনালী ব্যাংকের শাখায় টাকা আনা হয়। ব্যাংক শাখার ম্যানেজার নিজাম উদ্দিন এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ১৪ জন সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার সদস্যের উপস্থিতিতেই ব্যাংক কর্মচারী ও কর্মকর্তারা টাকা গুণতে শুরু করেন। ঠিক এই মুহূর্তেই কেএনএফের এক নারী সদস্য ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং প্রায় সাথে সাথে কেএনএফের কয়েকজন সশস্ত্র সদস্য ব্যাংকটি ঘেরাও করে এবং বাকীরা ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে লুটতরাজ চালায়।

কেএনএফ সন্ত্রাসীদের ডাকাতির পর থানচির ‍কৃষি ব্যাংক

জানা গেছে, কেএনএফ সন্ত্রাসীরা প্রথমে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ১৪টি অস্ত্র (এসএমজি ২টি, শটগান ৪টি ও চাইনিজ রাইফেল ৮টি) ও ৪১৫ রাউন্ড গুলি ছিনিয়ে নেয় এবং এরপর ভাঙচুর চালিয়ে প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা ছিনিয়ে নেয়। অন্য একটি সূত্রমতে, টাকার পরিমাণ ২ কোটি।

প্রায় আধা ঘন্টাব্যাপী লুটতরাজ ও ভাঙচুর চালানোর পর উক্ত টাকা, অস্ত্র, গুলিসহ ব্যাংকের শাখার ম্যানেজারকেও অপহরণ করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রায় ১৬ ঘন্টা অতিবাহিত হলেও অপহৃত ব্যাংক ম্যানেজারের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

নানা প্রশ্ন

উক্ত ঘটনার পর এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, বান্দরবান সদর থেকে রুমা শাখায় টাকা আসার সাথে সাথে কেএনএফ সন্ত্রাসীরা কিভাবে জানলো? নির্ভরযোগ্য কেউ খবর না দিলে কেএনএফের পক্ষে সেটা জানা সম্ভব নয়। পূর্ব অবহিত ও পূর্ব পরিকল্পিত না হলে এত জনবহুল জায়গায় প্রকাশ্যে এই ডাকাতি সফল হতো না। মাত্র ১৩ জন সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ১৪ জন সশস্ত্র পুলিশ ও আনসার সদস্যরা কেন কোনো প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো না? সন্ত্রাসীরা আধা ঘন্টা যাবৎ ঘটনাস্থলে অবস্থান করলেও মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বে থেকেও সেনাবাহিনী কেন তাৎক্ষণিকভাবে এগিয়ে আসলো না? ফলে অনেকের কাছে এই প্রশ্ন আসছে যে, এই ঘটনার সাথে সেনাবাহিনী বা ডিজিএফআই ও স্বয়ং ব্যাংকের কোনো কর্মচারী-কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন কিনা?

আরো উল্লেখ্য যে, অনেকের কাছে এই প্রশ্নও উঠছে যে, সাম্প্রতিককালে কেএনএফ সন্ত্রাসীদের এরূপ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পশ্চাতে খোদ সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআই এর মদদ ও ষড়যন্ত্রের নীলনকশা রয়েছে কিনা?

উল্লেখ্য যে, গত ৫ নভেম্বর ২০২৩ সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআই এর মধ্যস্থতায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহ্লা মারমার নেতৃত্বে গঠিত শান্তি কমিটির সাথে কেএনএফ প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ঐক্যমতের অন্যতম বিষয় ছিল সংলাপ চলাকালীন কেএনএফ এবং সেনাবাহিনী পরস্পরের উপর আক্রমণ করবে না। সর্বশেষ ৩য় বার গত ৫ মার্চ ২০২৪ তারিখ রুমায় বেথেল পাড়ায় সেনা ও ডিজিএফআই এর প্রতিনিধির উপস্থিতিতে শান্তি কমিটির সাথে বৈঠক হয়।

দেখা গেছে, বৈঠকের পরপরই কেএনএফ সন্ত্রাসীরা তাদের চাঁদাবাজি, জনগণকে মারধর, হুমকি ও অপহরণসহ নানা সন্ত্রাসী কার্যক্রম আরো জোরদার করে থাকে। কিন্তু সেনাবাহিনী, প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআই এর প্রশ্রয়ের কারণে কেএনএফ সন্ত্রাসীরা বর্তমানে অধিকতর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সেনা তল্লাসি, ভয়ে গ্রামছড়া বম জনগোষ্ঠী

এদিকে জানা গেছে, রুমা শাখা সোনালী ব্যাংকের ডাকাতির ঘটনার পর রুমার বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী তল্লাসি অভিযান এবং জনগণকে জিজ্ঞাসাবাদ ও হয়রানি শুরু করেছে। ইতিমধ্যে পাওয়া প্রাথমিক খবরে জানা গেছে, মুননোয়াম পাড়া, বেথেলপাড়া, হ্যাপিহিল পাড়া, বাচত্লাং পাড়া, আর্থা পাড়া ইত্যাদি বম গ্রামের লোকজন সেনা নিপীড়ন ও হয়রানির ভয়ে অন্যত্র পালিয়ে গেছে।
সর্বশেষ থানচিতেও ডাকাতি

সর্বশেষ আজ (৩ এপ্রিল ২০২৪) দুপুর ১২.০৮টার সময় কেএনএফ কর্তৃক থানচি উপজেলার সোনালী ব্যংক ও কৃষি ব্যাংকে হামলা করা হয়। এই ঘটনায় কেএনএফ সন্ত্রাসীরা দুটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ লাখ টাকা লুট করতে সমর্থ হয়। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ এবং কৃষি ব্যাংক থেকে ৪ লাখ৷

জানা গেছে, আগে থেকেই সাদা পোশাকে ২-৩ জন কেএনএফ সদস্য ব্যাংকের চারপাশে ঘোরাফেরা করছিল। ব্যাংক লুটের ঠিক ১০ মিনিট আগে সেনাবাহিনীর ১টি জীপ বাজারে এসে চলে যায় এবং তার পরক্ষণেই কেএনএফের ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল বাকতলাই সড়ক হয়ে থানচি বাজারে প্রবেশ করে। বাজারে এসেই সোনালী ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রহরীদের অস্ত্র তাক করে সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে ঢুকে পড়ে এবং ব্যাংকে থাকা গ্রাহক ও কর্মচারীদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। পরে ব্যাংকসমূহের ক্যাশ বাক্স থেকে মোট ১৯ লাখ টাকা লুট করে চলে যায়। যাওয়ার সময় তারা ৪-৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে চলে যায়।

জানা গেছে, ব্যাংক দুটি থানচি পুলিশ ক্যাম্প ও বিজিবি ক্যাম্পের মাঝখানে অবস্থিত।

উল্লেখ্য, সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআইয়ের সহায়তায় ২০০৮ সালে নাথান বম ও ভাংচুনলিয়াম বমের নেতৃত্বে কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলাপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও) গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআইয়ের ইন্ধনে কেএনডিও-এর নাম পরিবর্তন করে কেএনএফ রেখে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করে। পরে একটি ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠীকে অর্থের বিনিময়ে আশ্রয় ও সামরিক প্রশিক্ষনের খবর প্রচার হলে আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে সেনাবাহিনী কেএনএফের বিরুদ্ধে অপারেশন চালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআই কৌশলে কেএনএফকে মদদ দিতে থাকে। ২-৩ এপ্রিল সেনাবাহিনী ও পুলিশের সন্নিকটস্থ পর পর তিনটি শাখার ব্যাংক ডাকাতির ঘটনাও সেনাবাহিনী ও ডিজিএফআইয়ের মদদ ছাড়া কেএনএফের পক্ষে কখনো সম্ভব হতো না বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন।