রাষ্ট্র ও সরকার আদিবাসীদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র করছেঃ আদিবাসী দিবসে সন্তু লারমা

0
748

হিল ভয়েস, ৯ আগস্ট ২০২২, ঢাকা: ঢাকায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) অভিযোগ করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকার আদিবাসীদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে।’

আজ (৯ আগস্ট ২০২২) সকাল ১০:৩০ টার দিকে দিবসটি উপলক্ষে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে একথা বলেন আদিবাসী নেতা সন্তু লারমা।

অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল ১০:০০ টায় আদিবাসী ব্যান্ডদল মাদল ও অন্যান্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে গণসঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। এরপর জাতিসংঘ সেক্রেটারি জেনারেলের বাণী পাঠ করেন অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন আদিবাসী ফোরামের ভূমি ও আইন বিষয়ক সম্পাদক উজ্জ্বল আজিম ও কেন্দ্রীয় সদস্য মেইথিন প্রমীলা।

আলোচনা সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আদিবাসী নারী পরিষদের সভাপতি বাসন্তী মুর্মু এবং অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি, তথ্য মন্ত্রণায়লয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন কনা, পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা কাজল দেবনাথ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী শাহীন আনাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, বাসদ এর সহ সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবীর, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, হেকস ইপার এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ডোরা চৌধুরী, বাপা এর সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান এসোসিয়েশন এর সভাপতি নির্মল রোজারিও, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর সহ সাধারণ সম্পাদক ডা. গজেন্দ্রনাথ মাহাতো সহ বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র-যুব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

আলোচনা সভার সভাপতি সন্তু লারমা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র ১৯৭২ সালে সংবিধানে বাংলাদেশে বসবাসরত সকল নাগরিকদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে আদিবাসীদের পরিচয় কেড়ে নিয়েছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে এবং করে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন সামরিক শাসন চলছে। এমন কোন পরিবার নেই যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার আজকাল গালভরা উন্নয়নের কথা বলে। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামেও উন্নয়নের কথা শোনান, কিন্তু সেই উন্নয়ন কাদের স্বার্থে তা গভীরভাবে ভেবে দেখলেই বোঝা যায়। এই উন্নয়ন পার্বত্য আদিবাসীদের ভূমি, অস্তিত্ব ধ্বংস করার উন্নয়ন।’

তিনি তাঁর আলোচনায় তরুণদের আগামী দিনের লড়াইয়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘তরুণদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা আর প্রবীণদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। আমরা যারা প্রবীণ দীর্ঘদিন ধরে লড়াই সংগ্রাম করেছি, আদিবাসীদের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য অধিকার আদায় করতে পারিনি। বরং দিনদিন আদিবাসীদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। প্রবীণদের অসমাপ্ত কাজ আপনাদের শেষ করতে হবে। আপনাদের প্রতি সেই আহবান জানাই।’

আদিবাসী নারী নেত্রী বাসন্তী মুর্মু তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আজ নারীরা সংসার চালায়, সন্তান লালন-পালন করে আবার দেশও চালায়। কিন্তু নারীরা সমাজে দেশে সম্মান পায় না, বরং নির্যাতিত হয়। আমাদের আদিবাসী সমাজেও গারো আর খাসিয়ারা বাদে নারীরা ভূমির অধিকার পান না। আমরা সকল আদিবাসী সমাজে আদিবাসী নারীদের ভূমির অধিকার চাই। পাশাপাশি রাষ্ট্র গঠনে অংশগ্রহণ করতে পাহাড়ে আর সমতলে আদিবাসী নারীদের জন্য সংসদীয় আসন চাই। পাশের দেশ ভারতে আদিবাসী নারী রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, অথচ আমাদের দেশের সংসদে আদিবাসীদের নিয়ে কথা বলার কেউ নাই।’

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘বাংলাদেশের আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। এই স্বীকৃতি পাওয়া তাদের রাজনৈতিক অধিকার। রাষ্ট্রকে তাদের অধিকার মেনে নিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের প্রুতিশ্রুতি দিলেও এখনো বাস্তবায়ন করেনি।’

জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু বলেন, আজকে যারা বলেন ‘আদিবাসী বললে সংবিধান লঙ্ঘন হবে, তারা আসলে সংবিধান বুঝেন না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের নারী সুরক্ষা আইন দরকার। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।’ তিনি আদিবাসীদের রক্ষায় সরকারের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি।

আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা সাম্প্রতিক তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পাঠানো আদিবাসী বিষয়ক পরিপত্র সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি অবাক হয়ে গেলাম, আজকে তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদের সংবিধান রক্ষা করে চলতে বলেছে। আমি সরকার এবং মন্ত্রণালয়কে বলবো আপনারাই সংবিধান রক্ষা করে চলেন। আপনারাই সংবিধান লঙ্ঘন করে আদিবাসীদের লাঞ্ছনা বঞ্চনা করেন।’

আদিবাসী দিবসের উদ্বোধক বিশিষ্ট নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘সাম্প্রতিক জনশুমারীতে দেখা গেছে যে আদিবাসীদের-হিন্দুদের সংখ্যা অনেক কমেছে। কিন্তু আমি বলি আসলে কমছে না, তাদের লুন্ঠন করা হয়েছে, তাদের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আদিবাসীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারতাম, কীভাবে প্রকৃতিকে ভালবাসতে হবে, কীভাবে সন্তানের মতন ধরিত্রীকে ভালবাসতে হবে, কীভাবে মানুষকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের অবহেলা করেছি। আমরা শিখেছি মানুষকে অবহেলা করতে, শিক্ষকদের গলায় জুতার মালা পরাতে। আগামীতে আমাদের এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেসবাহ কামাল বলেন, ‘আদিবাসীরা বারবার লাঞ্ছিত হচ্ছে। তাদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই আচরণ করা রাষ্ট্রের মোটেও কাম্য নয়।’ তিনি রাষ্ট্রকে মানবিক হয়ে আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের জন্য আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম। আজ বৈষম্য হচ্ছে। আমাদের আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের অধিকার আদায় করতে হবে।’

মানবাধিকারকর্মী খুশি কবির বলেন, ‘আদিবাসীদের নিয়ে যে সার্কুলার জারি করা হয়েছে-তা মেনে নেওয়া যাবে না। আদিবাসীদের জয় অবশ্যই হবে।’

এছাড়া আদিবাসী দিবসের আলোচনায় উপস্থিত অতিথিবৃন্দ সরকারের নিকট আদিবাসীদের স্বীকৃতি, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন, সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন ও মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানান। তারা সম্প্রতি তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো পরিপত্রে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার না করার নির্দেশের তীব্র নিন্দা জানান।

আলোচনা শেষে আদিবাসী কালচারাল ফোরাম ও অন্যান্য আদিবাসী সাংস্কৃতিক দলের অংশগ্রহনে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। তারপর এক বর্ণাঢ্য র‌্যালি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে বাংলা একাডেমি হয়ে আবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আদিবাসী দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানস্থলে এসে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।