বিলাইছড়িতে সেনাবাহিনী কর্তৃক এক জুম্ম গ্রাম উচ্ছেদের পাঁয়তারা, ঘরবাড়ি ও দোকানে অগ্নিসংযোগ

0
492

হিল ভয়েস, ১৫ মার্চ ২০২৩, রাঙামাটি: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক রাঙামাটি জেলাধীন বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে সীমান্ত সংযোগ সড়ক সংলগ্ন প্রত্যন্ত এলাকার জুম্ম অধ্যুষিত গাছবান গ্রামটি দীর্ঘদিন ধরে উচ্ছেদের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ওই গ্রামের ২৬ পরিবারের মধ্যে ১৭ পরিবার অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং বাকী ৯ পরিবারকেও সেনাবাহিনী কর্তৃক সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অবশিষ্ট ৯ জুম্ম পরিবারকে গ্রাম থেকে উচ্ছেদের জন্য সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রতিনিয়ত গ্রামবাসীদের হুমকি-ধামকি প্রদান, গালিগালাজ ও হয়রানি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি সেনাবাহিনী কর্তৃক জুম্মদের একটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, দুটি দোকান ভাঙচুর এবং চার পরিবারের জুমে কাটা মাটি ফেলে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অপরদিকে, জুম্মদের উচ্ছেদ করা হলেও সড়কের পাশে নতুন সেনা ক্যাম্প এবং বড় মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানান গ্রামবাসীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১ মার্চ ২০২৩ দুপুর আনুমানিক ১২:০০ টার দিকে সেনাবাহিনীর ৩৪ বীর বেঙ্গলের গাছবান সেনা ক্যাম্পের সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আহমেদ ও ওয়ারেন্ট অফিসার গোবিন্দের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি দল গাছবান গ্রামে গিয়ে জুম্মদের দুটি দোকান ভেঙে দেয়। দোকানের মালিকরা হলেন- (১) চিবুক্যে চাকমা (৩৫), পিতা- লাল মন চাকমা ও (২) বসু চাকমা (৩০), পিতা- মনি চাকমা।

উক্ত ঘটনার প্রায় এক ঘন্টা পর, সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আহমেদ আরও দুই সেনা সদস্য সঙ্গে নিয়ে বাত্যে লাল চাকমা (২৫) পিতা- বুদ্ধলীলা চাকমা নামে এক গ্রামবাসীর বাড়ি ভেঙে ফেলতে যায়। এসময় বাত্যে লাল চাকমা বাড়িতে ছিলেন না, তিনি অন্যত্র এক বিয়ের অনুষ্ঠানে যান। এসময় সেখানে উপস্থিত গ্রামের কার্বারি ‘মালিক না আসা পর্যন্ত জ্বালিয়ে না দেওয়া’র অনুরোধ করলে সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আহমেদ থেমে যান। কিন্তু মালিক বাড়িতে ফিরে আসার আগেই সেনা সদস্যরা বিকেলে বাড়িটি জ্বালিয়ে দেয়।

নিজেদের আয়ের উৎস দোকান ও আশ্রয়স্থল বাড়ি হারিয়ে উক্ত গ্রামবাসীরা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও কঠিন অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

গাছবান সেনা ক্যাম্পের সেনা সদস্যরা উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে ওই ৯ পরিবারকে জুম চাষেও নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছে বলে জানা গেছে। কিছুদিন আগে সেনা সদস্যরা তাদের ট্রাক্টর দিয়ে মাটি কেটে এনে জুমের জন্য নির্ধারিত জায়গার উপর সেই মাটি ঢেলে দিয়েছে। এতে চার পরিবারের জুমচাষ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ভুক্তভোগী চার পরিবার হল- (১) কার্বারি শুভময় চাকমা (৪৫), পিতা- মণি চাকমা, (২) অমর বিজয় চাকমা (২৫) পিতা- ফরক ধন চাকমা, (৩) বাত্যে লাল চাকমা (২৫), পিতা- বুদ্ধলীলা চাকমা ও (৪) বুদ্ধ লীলা চাকমা (৬৫) পিতা- অজ্ঞাত।

উক্ত ঘটনার কিছুদিন আগে, স্থানীয় কার্বারি শুভময় চাকমা গাড়িতে করে ফারুয়া যাওয়ার পথে সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আহমেদ কার্বারিকে গাড়ি থেকে নামতে বাধ্য করে। এসময় সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আহমেদ কার্বারির কাছে ‘কেনো গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছো না’ বলে কৈফিয়ত চান এবং গালিগালাজ করে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

এর কয়েক দিন পরে, ওই ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন মারুফ গ্রামে গিয়ে গ্রামের কেউ জুমে আগুন দিতে পারবে না বলে নির্দেশ দিয়ে আসেন। ক্যাপ্টেন মারুফ আরও বলেন, ‘এখানে আমি তিনমাস  থাকবো, দেখবো তোমরা কিভাবে জুমে আগুন দেয়।’ তারপর তিনি গ্রামবাসীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।

উল্লেখ্য, গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ গাছবান সেনা ক্যাম্পের ২৬ বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর এর ক্যাপ্টেন মারুফ ও সুবেদার মো: আহম্মেদ ফারুয়া ইউনিয়নের গাছবান পাড়া এলাকার কার্বারি (গ্রাম প্রধান)সহ ৯ জুম্ম পরিবারকে নিয়ে এক সভা ডেকে ১৫ দিনের মধ্যে নিজেদের বাড়িঘর ও জিনিসপত্র নিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

এর আগে ৩০ জানুয়ারি ২০২৩ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বিলাইছড়ি-বরকল এলাকার সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে তিনিই উক্ত ৯ জুম্ম পরিবারকে তাদের আবাসস্থল থেকে উঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে যান বলে জানান ক্যাপ্টেন মারুফ।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফারুয়া এলাকার এক মুরুব্বি বলেন, সেনাবাহিনী মূলত ওই এলাকায় তাদের পর্যটন ব্যবসা কেন্দ্র স্থাপন করার উদ্দেশ্যেই উক্ত গ্রামবাসীদের জায়গাটি দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে। 

তিনি বলেন, সেনাবাহিনী শুধু সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করছে না। তারা সীমান্ত সড়কের নামে জুম্মদের ধনসম্পদ ধ্বংসসহ স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে এবং পর্যটন ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে আকর্ষণীয় জায়গাগুলো নিজেদের দখলে নিচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় সংরক্ষিত এলাকা বা সেনাবাহিনীর জায়গা বলে সাইনবোর্ডও স্থাপন করছে।

উল্লেখ্য, কেবল গত বছর (২০২২ সাল) সরকার ও সেনাবাহিনীর এই একতরফা সীমান্ত সড়ক ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের ফলে তিন পার্বত্য জেলায় অন্তত ৫০০ জুম্ম পরিবার ক্ষতির শিকার হয়েছে।