বিপ্লবী এম এন লারমার ৮২তম জন্মদিন ও কিছু প্রাসঙ্গিক ভাবনা

0
298
তরুণ ছাত্র এম এন লারমা

সুহৃদ চাকমা

বিশ্ব জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রচন্ড ডামাডোলের মধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই বাঁধের ফলে ডুবে যাওয়া অন্যতম সমৃদ্ধ গ্রাম মাওরুমে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আজ হতে ৮২ বছর আগে ১৯৩৯ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর মহান বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জন্ম হয়। মৃত্যুর ৩৭ বছর পরেও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এখনো প্রাসঙ্গিক। জুম্ম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই যুগের অধিক লড়াই করা সশস্ত্র গেরিলা দলের সংগঠক, নিপীড়িত জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের আন্দোলনের একজন পুরোধা, জুম্ম জনগণের অবিসংবাদিত নেতা, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের সুদক্ষ রাজনৈতিক নেতা ও বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আজ ৮২তম জন্মদিন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করেছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আজীবনই। তবে তিনি শুধু পাহাড়ের মানুষের নেতা ছিলেন না; তাঁর সংগ্রাম ছিল দেশের সব নিপীড়িত মানুষের পক্ষে, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে। দেশে দেশে জাতিগত, শ্রেণিগত শোষণ-নিপীড়ন, মানুষে মানুষে বৈষম্য, বঞ্চনা ও নির্মম বাস্তবতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। সেই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এম এন লারমার আদর্শ এখনো নিপীড়িত মানুষের লড়াইয়ের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে চলেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের চাকা বদলে দেওয়ার আপ্রাণ লড়াই চালিয়েছিলেন তিনি। জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে জনসংহতি সমিতির পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তিনি পরিষ্কার করে জানতেন, বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অত্যাচার, অবিচার ও শোষণ-নিপীড়নের স্টিমরোলার কাউকে মুক্তি দেবে না। সে হতে পারে সামন্ত, সে হতে পারে পুঁজিপতি, সে হতে পারে সরকারি আমলা, সে হতে পারে শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ইত্যাদি শ্রেণি পেশার জুম্ম জনগোষ্ঠীর লোকজন। বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-নিপীড়নের নির্মম বাস্তবতা থেকে কোন জুম্ম জনগোষ্ঠীই মুক্তি পাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও বাস্তবতার নিরিখে তিনি একদিকে সামন্তদের কোলে নিয়ে নিপীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত জুম্ম জনগণকে চিহ্নিত করেছেন সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে, সেই অনুযায়ী গড়ে তুলেছেন সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী এবং প্রচলন করেছিলেন পাহাড়ের বুকে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমি অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জঙ্গলের সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম তরুণরা আজও হাঁটছে তার দেখানো পথ ধরে। আজকের এই দিনে প্রিয়নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন ও সংগ্রামের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সাথে স্মরণ করতে চাই। এম এন লারমার সংগ্রাম পাহাড়ের বুকে আজও শেষ হয়ে যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে যতদিন আলুটিলা, ফুরোমোন ও কেওক্রাডং এর পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে থাকবে, যতদিন চেঙ্গে, মাইনী, কাচালং, কর্ণফুলী, শঙ্খ ও মাতামুহুরি নদীগুলো বহমান থাকবে, ততদিন পর্যন্ত মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দখলদার বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

নিপীড়িত জুম্ম জনগণের প্রিয়নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসা থেকেই তাঁর জন্মদিনে কিছু না লিখে চুপ করে বসে থাকা যায় না। মহাননেতার প্রতি জুম্ম জনগণের ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ প্রতিফলন ঘটাতে মূলত জন্মদিবসকে কেন্দ্র করে নানান আয়োজন ও কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাসের বাস্তব শিক্ষাসমূহ থেকে পাওয়া প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার আলোকে পাহাড়ের পরিস্থিতি ও বাস্তব সমস্যাসমূহ বিচার-বিশ্লেষণ করা আশু প্রয়োজন। জুম্ম জাতির মুক্তির আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে প্রিয়নেতার রেখে যাওয়া লড়াই সংগ্রামের অনেক স্মৃতি ও তাঁর অবদানসমূহ উল্লেখ করে অনেক গল্প হবে, অনেক আলাপ-আলোচনা ও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে লেখালেখির মাধ্যমে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হবে এটাই স্বাভাবিক বিষয়। এভাবে মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জীবন ও সংগ্রামের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের আপোষহীন লড়াইয়ের ইতিহাসকে তাঁর জন্মদিবসে শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সাথে স্মরণ করা হবে। মহাননেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে জানা ও তাঁর জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাসকে গভীরে গিয়ে বুঝতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়, তাঁর জীবন ও সংগ্রামকে জানতে হলে তাঁর দেখানো পথে আজীবনই হাঁটতে হবে। তাঁর প্রদর্শিত আদর্শের গভীরতায় ডুব দিতে হবে, রক্ত-পিচ্ছিল ও আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে চলার সাহস, শক্তি ও মনোবল হৃদয়ের গভীরে গেঁথে রাখতে হবে। সেই সাথে পুরানো সামন্তীয় সমাজের ধ্যান-ধারণা থেকে বেড়িয়ে এসে সত্যিকার অর্থে যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত চিন্তাভাবনা সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যেই মহাননেতার এই মহান সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। পুরানো ধ্যান-ধারণা বিলোপ সাধন করে সমগ্র সমাজের প্রগতি ও বিকাশের ধারায় নতুন করে নবজাগরণ সৃষ্টি করতে হবে।

যাঁর হাত ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু হয়েছে, তাঁরই প্রদর্শিত নীতি ও আদর্শের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে আপোষহীন লড়াই সংগ্রাম চলমান রয়েছে। দেশের শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসী দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে দীর্ঘকাল ধরে নিরন্তর গতিতে এগিয়ে চলেছে। প্রয়াতনেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার যোগ্য উত্তরসূরী নিপীড়িত জুম্ম জনগণের আরেক প্রিয়নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার সুদক্ষ নেতৃত্বে অধিকার আদায়ের আন্দোলন এখনো পর্যন্ত এক-পাও পিছপা হয়নি। দীর্ঘ দুই যুগের অধিক প্রিয় অগ্রজদের সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামের অনন্য অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষাসমূহ বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে নিপীড়িত জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষা করতে তরুণ প্রজন্মকে সদা সর্বদাই প্রস্তুত হতে হবে। নতুন কিছু আবিষ্কার করা এবং যুগোপযোগী চিন্তাধারার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে আমাদের জুম্ম তরুণদের প্রয়াতনেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার চিন্তাজগতের গভীরে প্রবেশ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার অবদান চিরস্মরণীয়। এজন্যই প্রিয়নেতা ৩৭ বছর আগে মারা গেলেও এখনো তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ গোটা দেশের অগণিত মানুষের মনে জাজ্বল্যমান। পার্বত্য চট্টগ্রামে সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরোটা সময় ধরে দীপ্যমান থাকেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। এখানে আজও প্রিয়নেতার প্রদর্শিত চিন্তাধারাকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের অনেক সম্ভাবনাময়ী জুম্ম তরুণ।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর সংগ্রামী জীবনে বিশ্বাস করতেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জুম্ম জনগণই পার্টির বড় শক্তি। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত এবং সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্য থেকেই অনেকেই সামন্তীয় ধ্যান-ধারণা থেকে বেড়িয়ে এসে পার্টির প্রাণ হিসেবে আবির্ভূত হন। প্রিয়নেতার প্রদর্শিত চিন্তাধারাই মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের চাকা বদলে দিয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের ফলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্ধকারাচ্ছন্ন, ঘুণেধরা, পশ্চাৎপদ সামন্তবাদী সমাজ থেকে অতি অল্প সময়ে জুম্ম সমাজের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও তাঁদের পরিবারের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জীবদ্দশায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা রাজনৈতিক দর্শন চর্চা ও অনুশীলনে যেমন নিপীড়িত জুম্ম জনগণের সংগ্রামী প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন, তেমনি শত্রু বাহিনী তথা শাসকগোষ্ঠীর গভীর দুশ্চিন্তারও কারণ হয়েছিলেন তিনি। তারপরও আমৃত্যু বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন। উঁচু মাপের এই মানুষটির জন্মদিবসে স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়ের নিপীড়িত জুম্ম জনগণ উদ্বেলিত হবে। প্রবল উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে এই দিনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জুম্ম জনগণ স্মরণ করবে বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।

সত্যিকার অর্থে কর্মের মাধ্যমেই একজন মানুষের জন্মের সার্থকতা নির্ভর করে। প্রিয়নেতার জন্ম সার্থক হয়ে গড়ে ওঠে মূলত প্রগতিশীল চিন্তাধারা বিকাশ সাধনের মধ্য দিয়ে, যাতে মৃত্যুর পরেও তিনি পৌঁছে গেছেন এক নতুন উচ্চতায়। তাঁর সেই প্রগতিশীল চিন্তাধারার আলোকে তিনি চিন্তা করতেন অনেক উঁচুতে ও অনেক গভীরে। কিন্তু জীবন যাপন করতেন অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে। ছাত্র জীবন থেকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘুণেধরা ও পশ্চাৎপদ সামন্তীয় সমাজের বেড়াজাল ছিঁড়ে, ভোগবাদী সমাজের দালালীপনাকে চরমভাবে ঘৃণা করে এবং শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জুম্ম জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন মানুষের কাছে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। পশ্চাৎপদ সামন্তীয় সমাজের বেড়াজালে বন্দী থাকা পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও আমরা গভীরভাবে অনুভব করেছি যে, নিজের প্রচেষ্টায় নিপীড়িত জুম্ম জনগণের কান্ডারী সংগঠন জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এক পর্যায়ে পার্টির সভাপতির শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছাতে পেরেছিলেন এবং সফলভাবে দেশের সংসদীয় কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একজন সফল সাংসদই ছিলেন না, একজন রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও দক্ষতা তাঁর মধ্যে ব্যাপ্ত ছিল। দেশের প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন মানুষেরা যা নানাভাবে নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন।

পাকিস্তান আমলের কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ এবং অধুনা বাংলাদেশ আমলেও শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, বঞ্চনা ও দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জুম্ম জনগণ তীব্র গণআন্দোলন শুরু করেছিল। সেই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও জুম্ম জনগণের মুক্তির দিশারী এবং জুম্ম জাতির মহান অগ্রদূত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা একজন সফল শিক্ষক এবং একজন মহানুভব আইনজীবী হিসেবেও তাঁর সুনাম রয়েছে। ছাত্র জীবন থেকেই প্রগতিশীল চিন্তাধারার আলোকে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং সেই রাজনৈতিক ধ্যানধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন জুম্ম জনগণের উপর মরণ ফাঁদ কাপ্তাই বাঁধ চাপিয়ে দিয়েছিল, তখন এর বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার যেমনি ছিলেন তেমনিভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন দ্বিধাহীনভাবে। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্য জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে লিফলেটের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত করে নিরাপত্তা আইনের অধীনে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করেছিল। তারপরেও সেই সময় প্রিয়নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়, অবিচারের কাছে নতিস্বীকার করেননি। এক পর্যায়ে তিনি জুম্ম জনগণের নেতা হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রিয়মুখ হিসেবে সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন।

১৯৭২ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠার পর এক পর্যায়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সমস্ত পথ রুদ্ধ হলে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করতে বাধ্য হন। দেশের শাসকগোষ্ঠী যে ভাষায় কথা বলেছিল, সে ভাষাতেই আমাদের জুম্ম জনগণকে জবাব দিতে হয়েছিল। তাই নিপীড়িত জুম্ম জনগণকে আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে পাহাড়ের বুকে লড়াই সংগ্রাম রচনা করেছিলেন। এই সময় ৭০ দশকের অসংখ্য জুম্ম তরুণ দলে দলে জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামে যোগ দিতে শুরু করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এই সশস্ত্র গেরিলা বাহিনীটি শান্তিবাহিনী নামে অধিক পরিচিতি পায়। প্রকৃত অর্থে জুম্ম জনগণই ভালোবেসে এই সশস্ত্র গেরিলাদের নাম দিয়েছিলেন শান্তিবাহিনী, যা এক পর্যায়ে দেশের ক্ষুদ্র গন্ডি পেরিয়ে গোটা বিশ্বের দরবারে শান্তিবাহিনী নামে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বের দরবারে অন্যতম শক্তিশালী গেরিলা দল হিসেবে পরিচিতি পায়। এদের লক্ষ্য ছিল কেবল নিপীড়িত জুম্ম জনগণের মুক্তি। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে অভিনব গেরিলা যুদ্ধের পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হন এই মহাননেতার হাতে-গড়া জুম্ম জনগণের একমাত্র কান্ডারী সংগঠন জনসংহতি সমিতি। অপ্রতিরোধ্য গতিবেগে শাসকগোষ্ঠীর সকল বেড়াজাল ছিন্ন করে অধিকার আদায়ের আন্দোলন এগিয়ে যেতে থাকে। প্রিয় অগ্রজদের অসীম সাহস, শক্তি, পাহাড়সম মনোবল ও ধৈর্যের বাঁধ শাসকগোষ্ঠী কোনকালেই ভাঙতে পারেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়িত জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এভাবেই শুরু করেন প্রিয়নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এক দীর্ঘ পদযাত্রা। সেই দীর্ঘ যাত্রায় উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছিল নিপীড়িত জুম্ম জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা। পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম চারিদিকে হাজার হাজার মাইল পাহাড় ডিঙিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে শুরু হয়েছিল এই দীর্ঘস্থায়ী লড়াই সংগ্রামের পদযাত্রা, যা আজও থামেনি। এই দীর্ঘযাত্রায় জনসংহতি সমিতি তথা সমগ্র জুম্ম জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসী তাবেদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল। জুম্ম জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে এক পর্যায়ে সরকার তথা শাসকগোষ্ঠী জনসংহতি সমিতির সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। সত্য তো এটাই, দেশের শাসকগোষ্ঠীকে পরাস্ত করে নিপীড়িত জুম্ম জনগণের মুক্তির আন্দোলন ধাপে-ধাপে অগ্রসর হয়েছিল।

সবশেষে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছিলেন আসলে একজন সত্যিকারের খাঁটি দেশপ্রেমিক ও মানবতাবাদী। তিনি একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন এবং তার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন আমৃত্যু পর্যন্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই শুধু নয়, গোটা বিশ্বের আপামর মেহনতি মানুষের মুক্তিই ছিল তার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একই সাথে তিনি গড়ে তুলেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে সাথে নিয়ে প্রগতিশীল সংগঠন জনসংহতি সমিতি ও সমিতির অধীনে গ্রাম পঞ্চায়েত, মহিলা সমিতি, যুব সমিতি ও গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী এবং ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি গঠন করেন সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী। মানবতাবাদী আদর্শ ধারণ করেছিলেন তাঁর নিপীড়িত জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের স্বার্থে। পার্বত্য চুক্তির পূর্বের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের কঠিন পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আদর্শ ও তাঁর চিন্তাধারা আজও প্রাসঙ্গিক যা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তাঁর প্রদর্শিত মানবতাবাদী আদর্শ ও চেতনাকে ধারণ করে কঠিন পরিস্থিতির সাথে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাহাড়ের জুম্ম তরুণরা আজও ঝিরি-ঝর্ণা ও পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে মহান নেতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাই, ৮২তম জন্মদিনে মহান নেতার আদর্শ, তাঁর জীবন ও সংগ্রামের প্রতিটি ধাপগুলো আজও আলোচনা ও পর্যালোচনার দাবি রাখে। মহান নেতার আদর্শ ও চেতনার কোন মৃত্যু নেই, লারমার চেতনা-ভুলি নাই ভুলবো না! মহান নেতার জন্মক্ষণে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here