বাঘাইছড়িতে জনসংহতি সমিতির ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

0
331

হিল ভয়েস, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, রাঙ্গামাটি: আজ (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটি’র উদ্যোগে উগলছড়ি মুখ (বটতলা) কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক সুশীল চন্দ্র তালুকদার।

উদযাপন কমিটির সদস্য মন্টু চাকমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে সমিতির রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সহ-সভাপতি সুমতি রঞ্জন চাকমা এবং প্রধান আলোচক হিসেবে সমিতির বাঘাইছড়ি থানা কমিটির সাবেক সভাপতি প্রভাত কুমার চাকমা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাঘাইছড়ির তিন ইউনিয়ন পরিষদের (মারিশ্যা, খেদারমারা ও সারোয়াতুলি ইউনিয়ন) চেয়ারম্যানগণ ও কার্বারি প্রতিনিধি বিশ্বপ্রিয় চাকমা, যুব সমিতির সদস্য সুমেধ চাকমা প্রমুখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুমতি রঞ্জন চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অবিভাবক এবং রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি শত ঘাত-প্রতিঘাত, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে রক্ত-পিচ্ছিল সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে আজ ৫২ বছরে পদার্পণ করেছে। যেটি অত্যন্ত গৌরবের বিষয়।

তিনি বলেন, এই মহান পার্টি ১৯৭২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা লাভের পর অনেকেই মনে করেছিলেন এই পার্টির অল্প আয়ু, বেশিদিন টিকবে না, টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু মজার বিষয় দেখুন, আজ পার্টি ৫২ বছরে পদার্পণ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণকে সাথে নিয়ে মহান পার্টি জনসংহতি সমিতি ৫২ বছরে পদার্পণ করেছে। বরঞ্চ যারা বা যে দলগুলো একসময় এই জগাখিচুরি মন্তব্য করেছিলো আজ তাদের বা সেই দলগুলোর অস্তিত্বই নেই। বিলুপ্তি ঘটেছে তাদের।

তিনি আরও বলেন, হতাশার কোনো কারণ নেই। ৫২ বছরে পার্টিকে কেউ খতম করতে পারেনি, পারেনি পার্টিকে তার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নীতি ও আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্ছিন্ন করতে, আর ভবিষ্যতেও পারবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত নিপীড়িত জুম্ম জনগণকে সাথে নিয়ে মহান পার্টি জনসংহতি সমিতি একদিন অবশ্যই একটি শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেই করবে।

প্রধান আলোচকের বক্তব্যে প্রভাত কুমার চাকমা বলেন, একা এক ব্যক্তির পক্ষে খুব বড়ো কিছু করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের মলাট উল্টালে দেখা যায় পৃথিবীতে যে সমষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে অধিকার ভোগ করছে তারা একা কেউই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তারা সবাই মিলে একটি সংগঠন গঠনের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর নিজেদের বেঁচে থাকার অধিকার লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ঠিক একইভাবে সেই প্রয়োজন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামেও সেই ১৯৭২ সালের আজকের এই দিনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠালাভ করে।

তিনি বলেন, আমি মনেকরি মহান পার্টিকে আর কখনো কোনো শাসক বিলুপ্ত করে দিতে পারবে না। পার্টির সুদীর্ঘ ইতিহাসের পথচলার বাঁকে অনেক শাসক, অনেক দল বা সংগঠন এই পার্টিকে যতবারই আঘাত হানার চেষ্টা করেছে, যতবারই বিলুপ্তি ঘটানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে পার্টি ততবারই আরও শক্তিশালী হয়েছে, ততবারই পার্টির কর্মীরা আরও সংগ্রামী হয়েছেন। আমি মনেপ্রাণে এও বিশ্বাস করি, একমাত্র জনসংহতি সমিতির ও তার নেতৃত্বই পারবে জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষা করতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করতে এবং সেই বহুল প্রত্যাশিত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাঘাইছড়ি যুব সমিতির সদস্য সুমেধ চাকমা বলেন, যে নেতৃত্ব প্রগতিশীল নয়, যে নেতৃত্বে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে না, যে নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ থাকে না এবং যে নেতৃত্ব জনবিচ্ছিন্ন সে নেতৃত্ব চিরস্থায়ী নয়, সে নেতৃত্বের ধ্বংস অনিবার্য। পাহাড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিই একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন, যে সংগঠন ও নেতৃত্বের মধ্যে এসবকিছুর অস্তিত্ব বিদ্যমান। আর তার উজ্জ্বল প্রমাণ জনসংহতি সমিতির আজকে ৫২ বছরে পদার্পণ।

আলোচনা সভার শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে থেকে এযাবৎকালে জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই সংগ্রামে যারা জীবন উৎসর্গ তথা আত্মবলিদান দিয়েছেন তাঁদের স্মরণে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য বাবু সুব্রত চাকমা।