পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক

0
491

উষাতন তালুকদার

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই রাজনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের নীতি লঙ্ঘন করে অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির ফলে। উল্লেখ্য, স্মরণাতীত কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খিয়াং, লুসাই, খুমী, পাংখো ও চাক প্রভৃতি ভিন্ন ভাষাভাষি ১১টি জাতির বসবাস রয়েছে, যারা নিজেদেরকে ‘জুম্ম’ (পাহাড়ের অধিবাসী) হিসেবে পরিচিতি প্রদান করে থাকে। এছাড়া রয়েছে কিছু গোর্খা, অহমিয়া ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠী।

’৪৭ সালে দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯৮.৫ শতাংশ লোক ছিল অমুসলিম, যারা বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী। স্বভাবতই অমুসলিম জুম্ম জনগণ আশা করেছিল যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্ত হবে। এলক্ষ্যে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট জুম্ম জনগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের ষড়যন্ত্র ও তৎকালীন ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উদাসীনতার কারণে অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের উপর শুরু হয় নিপীড়ন-নির্যাতন ও অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার ষড়যন্ত্র, তথা জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের কার্যক্রম।

তারই অংশ হিসেবে জুম্ম জনগণকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করার উদ্দেশ্যে পঞ্চাশ দশকের প্রারম্ভে ভারত থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রিত হাজার হাজার মুসলমান জনগোষ্ঠীকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় বসতি প্রদান করা হয়। পাকিস্তান আমলে জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের সবচেয়ে মারাত্মক কার্যক্রম ছিল ষাট দশকে স্থাপিত জুম্ম জনগণের মরণ ফাঁদ কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ। এই বাঁধের ফলে নিজ বাস্তুভিটা থেকে এক লক্ষাধিক জুম্ম উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় চাষযোগ্য জায়গা-জমি না থাকায় এবং সুষ্ঠু পুনর্বাসন না করায় ৪০ হাজার চাকমা জনগোষ্ঠী ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, যারা এখনো অরুনাচল প্রদেশে নাগরিকত্বহীন জনগোষ্ঠী হিসেবে দুর্বিসহ জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করা তথা জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের কার্যক্রম আরো জোরদার হয়ে উঠে। ’৭২-এর সংবিধান প্রণয়নকালে তৎকালীন গণপরিষদের সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য চারদফা সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানান। কিন্তু সেই সংবিধানে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র শাসনতান্ত্রিক মর্যাদাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়। উল্টো সংবিধানে ভিন্ন ভাষাভাষি জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। দেশ স্বাধীন হতে না হতেই ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিকে লঙ্ঘন করে হাজার হাজার মুসলমানদেরকে খাগড়াছড়ির ফেনী অঞ্চলে বসতিপ্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়ার আমলে সংবিধানের চারটি মূলস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ ‘ধর্ম নিরপক্ষেতা’ মুছে দিয়ে “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” অন্তর্ভুক্তি এবং ১৯৮৮ সালে জেনারেল এরশাদের আমলে সংবিধানে “ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম” হিসেবে ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইসলামীকরণের ধারা জোরদার হয়ে উঠে।

১৯৭৯ সালে আশি দশকে সরকারী উদ্যোগে জুম্ম জনগণের জায়গা-জমির উপর বসতিপ্রদান করা হয় চার লক্ষাধিক মুসলিম জনগোষ্ঠীকে। জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের উদ্দেশ্যে শুরু হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগিতায় মুসলিম সেটেলার কর্তৃক বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রীষ্টান ধর্ম অনুসারী জুম্ম জনগণের উপর একের পর এক গণহত্যা, ভূমি বেদখল, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, ধর্মীয় পরিহানি, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, নারী ও শিশুর উপর সহিংসতা ইত্যাদি মানবতা বিরোধী কার্যক্রম। আশি ও নব্বই দশকে সংঘটিত হয় কমপক্ষে ১৫টি গণহত্যা।

শেখ হাসিনা সরকার জুম্ম জনগণের আন্দোলনের মুখে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকদের সাম্প্রদায়িক নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে চুক্তির কিছু বিষয় সরকার বাস্তবায়ন করলেও চুক্তির উপরোক্ত মৌলিক বিষয়সমূহসহ চুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়ন করতে এগিয়ে আসেনি। চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্যতম পক্ষ জনসংহতি সমিতির মতে, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে, যা বিভিন্ন স্বাধীন ও নিরপক্ষে গবেষক ও প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ফলাফলেও ফুটে উঠেছে। অথচ সরকার দেশে-বিদেশে অসত্য তথ্য প্রচার করছে যে, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি বাস্তবায়িত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের পরিবর্তে সরকার অতি সুক্ষ্ম কৌশলে রোহিঙ্গাসহ সমতল জেলাগুলো থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠী বসতিপ্রদান করে চলেছে। মুসলিম সেটেলারকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসনের পরিবর্তে সেটেলারদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণ করে জুম্মদের জায়গা-জমি জবরদখলে মদদ দেয়া হচ্ছে। আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে এখনো সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়গুলো হস্তান্তর করা হয়নি। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বিগত ২৬ বছরেও এসব পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সম্বলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের স্বশাসন ব্যবস্থা এখনো যথাযথভাবে গড়ে উঠেনি।

জুম্ম শরণার্থীদের সাথে সরকারের ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তি মোতাবেক ত্রিপুরা থেকে জুম্ম শরণার্থীদের ১২,২২২ পরিবার প্রত্যাবাসন করা হলেও এখনো তাদের জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ পূর্বক যথাযথ পুনর্বাসন করা হয়নি। এখনো ৯,০০০ পরিবার তাদের ভূমি ফেরত পায়নি। ৪০ গ্রাম এখনো মুসলিম সেটেলারদের দখলে রয়েছে। আভ্যন্তরীণ জুম্মদেরকেও পুনর্বাসন করা হয়নি। প্রায় এক লক্ষ পরিবার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু এখনো রিজার্ভ ফরেষ্টে বা আত্মীয়-স্বজনের জায়গা-জমিতে উদ্বাস্তু জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। মুসলিম সেটেলার কর্তৃক বেদখলকৃত একটি ভূমি বিরোধও নিষ্পত্তি করে জুম্মদের নিকট ফেরত দেয়া হয়নি। ভূমি কমিশন গঠিত হলেও কমিশনের বিধিমালা প্রণীত না হওয়ায় বিগত ২৬ বছরেও ভূমি কমিশন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির বিচারিক কাজ শুরু করতে পারেনি।

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে বর্তমান সরকার এখন পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকদের নীতি অনুসরণ করে পার্বত্যাঞ্চলে ব্যাপক সামরিকায়ন করে দমন-পীড়নের মাধ্যমে ফ্যাসীবাদী কায়দায় সমাধানের নীতি বেছে নিয়েছে। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সীর অবসান হলেও শেখ হাসিনা সরকার ২০০১ সালে ‘অপারেশন উত্তরণ’ নামে পার্বত্যাঞ্চলে সামরিক শাসন জারি করে। ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর ক্ষমতাবলে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। অধিকন্তু, ৫৪৫টি অস্থায়ী ক্যাম্পের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের অব্যবহিত পরে মাত্র ১০১টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার আবার নতুন করে একের পর এক নতুন ক্যাম্প স্থাপন করে চলেছে।

২০১৪ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। সরকার কেবল চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া বন্ধ রাখেনি, তার সাথে চুক্তিকে নানাভাবে পদদলিত করে চলেছে। এর ফলে চুক্তি-পূর্ব সময়ের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অধিকতর জটিল ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের চলমান পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনকে সরকার ‘সন্ত্রাসী’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘চাঁদাবাজি’ কার্যক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করে ক্রিমিনালাইজ করে চলেছে। ফলে জুম্ম জনগণের জীবনে নির্বিচারে গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় জড়িত করে জেলে প্রেরণ, জামিনে মুক্তির পর জেল গেইট পুন:গ্রেফতার, ক্রসফায়ারের নামে বিচার-বহির্ভুত হত্যা, ক্যাম্পে আটক ও নির্যাতন, রাত-বিরাতে ঘরবাড়ি তল্লাসী ও হয়রানি, নারীর উপর সহিংসতা ইত্যাদি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারগুলো কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে উস্কে দেয়া সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও উত্তেজনা নিরসনের পরিবর্তে বর্তমানে সাম্প্রদায়িক বিভেদমূলক প্ররোচনা আরো জোরদার করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক মুসলিম সেটেলারদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ নামক একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনে সংগঠিত করে পার্বত্য চুক্তি বিরোধী কার্যক্রম, ভূমি বেদখল, সাম্প্রদায়িক হামলা ইত্যাদি তৎপরতায় লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে। চুক্তি-উত্তর সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পৃষ্টপোষকতায় মুসলিম সেটেলার কর্তৃক জুম্ম জনগণের উপর ২০টি সাম্প্রদায়িক হামলা সংঘটিত হয়েছে। এসব হামলায় শত শত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। অনেক নারী ও শিশু ধর্ষণ যৌন সহিংসতার শিকার হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী আদিবাসী জুম্মদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গৃহ নির্মাণ, গরু-ছাগল পালন, সুদ-মুক্ত ঋণ ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে বান্দরবান জেলায় ধর্মান্তরকরণ চলছে। বান্দরবান জেলায় ‘উপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘ’, ‘উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা’ ও ‘উপজাতীয় আদর্শ সংঘ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি সংগঠনের নাম দিয়ে জনবসতিও গড়ে তোলা হয়েছে এবং এসব সংগঠনের মাধ্যমে জুম্মদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কাজ চালানো হচ্ছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্মীয় পরিহানি, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ও মন্দির স্থাপনে বাধা প্রদান করে চলেছে। এছাড়া প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর ছত্রছায়ায় পার্বত্যাঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়া, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা সালভাশন আর্মি (আরসা) সহ বিভিন্ন ইসলামী জঙ্গীগোষ্ঠী। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত এবং চট্টগ্রাম বন্দর ঘেষা এই পার্বত্যাঞ্চলটি যদি ইসলামী জঙ্গীগোষ্ঠীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তাহলে কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, এটা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য হবে চরম জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি।

সরকারের চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম থেকে এটা নি:সন্দেহ বলা যায় যে, শেখ হাসিনা সরকার আর চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না। পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকদের মতো শেখ হাসিনা সরকারও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অমুসলিম অধ্যুাষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করা এবং নানা নিপীড়ন-নির্যাতন ও ডেভেলাপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জুম্ম জনগণকে স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ ও দেশান্তরে বাধ্য করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করছে। এসবের ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জুম্ম জনগণকে জাতিগতভাবে নির্মূল করা। এভাবেই আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে জুম্ম জনগণের উপর নীবর গণসংহার বা সাইলেন্স জেনোসাইট (Silence Genocide)।

পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ তথা অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে সুরক্ষা দিতে হলে জুম্ম জনগণকে পার্বত্য চট্টগ্রামে টিকে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ, দ্রুত ও পূণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচনা করা হয়। এলক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ দেয়া; পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুটিকে ভারতীয় গণমাধ্যমে তুলে ধরার মাধ্যমে জনমত গঠন করা ও সারাবিশ্বে প্রচার ও জনমত গঠনের জোরদার করা; এবং জুম্ম জনগণের চলমান আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

উষাতন তালুকদার: সাবেক সংসদ সদস্য ও সহ সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রবন্ধটি তিনি ক্যাম্পেইন অ্যাগেনস্ট অ্যাট্রোসিটিস অন মাইনরিটি ইন বাংলাদেশ (ক্যাম্ব) ও অল ইন্ডিয়া রিফিউজি ফ্রন্টের যৌথ উদ্যোগে গত শনিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ পশ্চিম বঙ্গের কলকাতায় “মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন” শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপন করেন।