পাঁচতারা হোটেল নির্মাণ বিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের বক্তব্যের প্রতিবাদ চিম্বুক পাহাড়বাসীর

0
909

হিল ভয়েস, ১২ ডিসেম্বর ২০২০, বান্দরবান: নাইতং পাহাড়ে পাঁচতারকা হোটেল ও বিনোদনকেন্দ্র স্থাপনের নামে ম্রো জাতির ভূমি বেদখলের বিরুদ্ধে ম্রো আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের বক্তব্যের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার ১১ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে চিম্বুক পাহাড়বাসীর সংবাদ সম্মেলন করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে চিম্বুক পাহাড়বাসীর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মেনপং ম্রো। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, চিম্বুকের নাইতং পাহাড় ও আশেপাশের বেশ কয়েকটি এলাকার ম্রোদের শত শত বছরের ভোগ দখলীয় ভূমিতে সিকদার গ্রুপ (আরএনআর হোল্ডিংস) ও সেনাকল্যাাণ ট্রাস্ট মিলে একটি পাঁচ তারকা হোটেলসহ বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই পাঁচতারকা হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের ফলে আমাদের ভোগ দখলীয় আনুমানিক ৮০০ থেকে ১০০০ একর ভূমি বেআইনিভাবে দখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কাপ্রু পাড়া, দলা পাড়া, এরা পাড়া ও কোলাই পাড়াবাসী ফলে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির শিকার হবে এবং আরও ৮ টিরও অধিক পাড়া পরোক্ষভাবে ক্ষতির শিকার হবে। পাড়াবাসীরা উচ্ছেদের শিকার হবো এবং আমাদের স্বাভাবিক ও সাংস্কৃতিক জীবন জীবিকার চরম ব্যাঘাত ঘটবে। এই প্রকল্পের ফলে তাদের চাষের ভূমি, ফলজ বাগান, পবিত্র জায়গা, শশ্মান ঘাট ও পানির উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়াও সংরক্ষিত পাড়াবন ও জীব বৈচিত্র ধ্বংস হবে।

এ বিষয়ে তারা শুরু থেকেই নানাভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে আপত্তি জানিয়ে এসেছেন। তার জন্য বংশ পরস্পরায় আবাসকৃত ভূমিতে স্ব স্ব জীবন ব্যবস্থা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারের অধিকতর সুরক্ষার জন্য মানবিক ও ন্যায্য আবেদন নিয়ে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে গত ০৭/১০/২০২০ তারিখে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেন।  তারপরও এই বিষয়ে কোন উদ্যোগ দৃষ্টিগোচর না হওয়ায় বিগত ০৮/১১/২০২০ তারিখে চিম্বুকে কালচারাল শোডাউনের মাধ্যমে প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন।

লিখিত বক্তব্য তিনি আরও বলেন,  আমাদের এই প্রতিবাদ এবং মানসিক ও ন্যায্য আবেদনে সাড়া দেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও জেলা পরিষদের বিপরীতে অবস্থান আমাদেরকে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। একদিকে প্রকল্পের স্বপক্ষে প্রশাসন মিথ্যা প্রলোভন ও নানা ধরনের হয়রানির মাধ্যমে আলিকদম উপজেলার ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে মানবন্ধনে দাঁড় করিয়ে পাঁচতারকা হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্রের ব্যাপারে ম্রো জনগোষ্ঠীর অবস্থানকে দেশের মানুষের কাছে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে এই প্রকল্পের ব্যাপারে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ তাদের  অবস্থান পরিষ্কার করতে প্রেস ব্রিফিঙে পাঁচ তারকা হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের পক্ষে সাফাই, মনগড়া ও মিথ্যাচার করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে যুক্তি দিয়ে বলা হয়, জেলা পরিষদ কর্তৃক জমি ইজারা প্রদান ও তৎসংক্রান্ত চুক্তিও আইন সম্মত নয়। পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক জেলা পরিষদের কাছে ভূমি ব্যবস্থাপনা হস্তান্তরিত না হওয়ায়, পরিষদ কাউকে ভূমি ইজারা দিতে পারে না। তর্কিত জমিটি জেলা পরিষদের নামে বন্দোবস্তিও নয়।

৩০২ নং মৌজার প্রাক্তন হেডম্যান স্থানীয়দের সাথে আলোচনা ব্যতিরেকে পরিষদের কাছে ৫.০০ একর ভূমি কৃষি চাষ ও খামার প্রদর্শনীর জন্য সুপারিশ করলেও সে ৫.০০ একর জমি কিভাবে ২০.০০ একর জমিতে পরিণত হল? ২০.০০ একর থেকে বাড়িয়ে ৮০০-১,০০০ একর ভূমির উপরে পাঁচ তারা হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের জন্য সেনা কল্যাণ সংস্থা ও সিকদার গ্রুপকে কিভাবে ইজারা দিল পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে চিম্বুক পাহাড়বাসী স্বচ্ছতার সাথে জবাবদিহির চান।

সংবাদ সম্মেলনে নাইতং পাহাড়ের পাচ তারকা হোটেল স্থাপনের প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করা, কাপ্রু পাড়া ও দলা পাড়াসহ চিম্বুকের ম্রোদের বংশ পরম্পরায় ভোগদখলীয় ভূমিতে কোন ধরনের পর্যটন বা বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা, নীলগিরি পর্যটনকেন্দ্র সম্প্রসারণের উদ্যোগ কোনভাবেই গ্রহণ না করা এবং যে উদ্দেশ্যেই চিম্বুক পাহাড়ের ভূমি ব্যবহার করা হোক না কেন তা স্থানীয় কার্বারি, হেডম্যান ও জনপ্রতিনিধি ছাড়াও চিম্বুক পাহাড়ের সকল পাড়াবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনা করা ইত্যাদি চারদফা দাবিনামা উত্থাপন করা হয়।