আমাদের বোধোদয় হবে কবে?

0
954

মিতুল চাকমা বিশাল

 

আমাদের মানসিক দৈন্যতা যে ঠিক পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেটা আর বলে প্রকাশ করার কোন অবকাশ নেই। আমরা এমন একটি উৎসুক আর আনন্দপ্রিয় জাতি যে, কেবল বাহিরের চাকচিক্যতেই আমাদের মনপ্রাণ ভরে, ভেতরের হাহাকার আমাদের স্পর্শ করতে পারে না, এতটাই চঞ্চল আমরা।

বেশ কিছুদিন ধরে বাইক রাইডিং সহ এই ছবিটির একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে চোখে পড়ছে। আমাদের অনেক উদার, শিক্ষিত ও তরুণ প্রজন্ম এই ভিডিওটি শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগও করে দিচ্ছে এবং প্রচারও করে দিচ্ছে। আর ক্যাপশনে সেই বাঙালিয়ানা আর শাসকগোষ্ঠীর ডমিনেটেড লেখা “এটিই হবে পাহাড়ের সবচেয়ে সুন্দর সড়ক/রাস্তা”।

আশ্চর্য্যজনক এটাই, পাহাড় কেটে তৈরি প্রশস্ত ও জিগজ্যাগ এই সড়কটি আমাদের হৃদয় হরণ করতে পারলেও, সড়কের পাশে মৃয়মান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোন এক জুম্ম পরিবারের ছোট্ট কুঠিরটি আমাদের কারো হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে নি। একইভাবে ক্ষত-বিক্ষত পাহাড়ের দৃশ্যগুলোও আমাদেরকে নাড়া দিতে পারে নি। অতএব, আমাদের পরস্পরের দূরত্বটা ঠিক কত যোজন যোজন হয়ে গিয়েছে এবং নিজেদের ভূমিকেও যে আমরা পণ্যে পরিণত করতে পারি, সেটাকেও আর বলার প্রয়োজন বোধ করছি না।

এখন, সত্যিই অবাক লাগে এই ভেবে যে, “আমাদের বোধোদয় হবে কবে?”

তাহলে বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করা যাক, ছবির এই সড়কটির অবস্থান রাঙ্গামাটির জুড়াছড়ি উপজেলার দুমদুম্যা ইউনিয়নে। এটি বাংলাদেশ সরকারের বহুল প্রতীক্ষিত চট্টগ্রাম-রাজস্থলী-বিলাইছড়ি-বরকল-ঠেগাডোর ট্রানজিটের সাথে সংযুক্ত সীমান্ত সড়ক। ইন্দো-বাংলা বর্ডারের করল্যাছড়ি গ্রাম থেকে এই সড়কটি মূল ট্রানজিটের সাথে যুক্ত হয়েছে। করল্যাছড়ি থেকে মূল সড়কে যাওয়ার জন্য এই জিগজ্যাগ পাহাড়টি বেয়ে উঠতে হয় থুম পাড়াতে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সীমান্ত সড়কটি তৈরির ফলে শুধুমাত্র বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়ন এবং দুমদুম্যা ইউনিয়নের প্রায় ২শ’ জুম্ম পরিবারের বাগান, বসতভিটা, জুমভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। আরো ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, এই জিগজ্যাগ সড়কটি উঠার পরেই নাগাল পাবেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর “চাইচাল সেনাক্যাম্প”। যে ক্যাম্পটি স্থাপনের জন্য ৩-৪টি জুম্ম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ঐ এলাকায় জুম না করার জন্য নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। আরো সুন্দর কথা হচ্ছে এই চাইচাল ক্যাম্পে একটি মডেল মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এখন এই মসজিদ থেকে সকাল-বিকাল পাঁচ-ওয়াক্ত নামাজের সুর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় সমগ্র দুমদুম্যা এবং ভারতের মিজোরামের চাকমা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের অল্প অংশেও। এই সড়কের পাশেই সম্প্রতি হেলিপ্যাড বসানোর জন্যে কয়েকটি জুম্ম পরিবারের ঘর ভাঙচুর করেছে সেনাবাহিনীর ২৬ ইসিবি ও কাপ্তাই ৫৬ বেঙ্গলের কতিপয় সেনা সদস্য। সীমান্ত সড়ক হওয়ার পূর্বে অত্রাঞ্চলের মানুষগুলো একটা স্বাধীনতা ভোগ করত, তার স্বাধীনভাবে চলাফেরা করত, আমাদের মা-বোনেরা নির্বিঘ্নে কুয়োর ঘাটে যেতে পারত। কিন্তু এই সীমান্ত সড়ক সেই স্বাধীনতাকে খর্ব করে দিয়েছে। সড়কে কর্মরত প্রায় ২-৩শ’ বহিরাগত বাঙালি শ্রমিক, প্রতিনিয়ত চলে সামরিক টহল।(বর্তমানে ৬৫ জনের একটি সেনাদল টহলে আছে)।

আরো কিছু তথ্য বলি, জুরাছড়ি উপজেলার এই দুমদুম্যা ইউনিয়নের পূর্বাংশে ভাঙাচোরা কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে(নামেমাত্র), শিক্ষক সংকটে কয়েকটি অচল, তার মধ্যে গন্ডাছড়া পাংখো পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তো কোন কালেই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। মাধ্যমিক কিংবা নিম্ন মাধ্যমিক কোন বিদ্যালয় সেখানে নেই। তবে হ্যাঁ, স্থানীয়দের অক্লান্ত পরিশ্রমে বগাহালি গ্রামে একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় চলছে বেসরকারিভাবে, সেটি বর্তমানে উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়েছে। পাঠদানের অনুমতি মিলেছে বছর-তিনেক আগে। সেই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন মাত্র ৪ জন, তাও সকলেই পুরুষ। আর চিকিৎসার কথা যদি বলি! সেটা একেবারে শূন্যের কোঠায়।

এসব কথার মূলে মেহেদী পাতা কবিতার লাইনটাই বেশি মনে পড়ে-
” মেহেদী পাতা দেখেছো নিশ্চয়ই?
উপরে সবুজ,ভেতরে রক্তাক্ত-ক্ষত-বিক্ষত”
আমাদের এই পাহাড়ও ঠিক তাই।

এই সড়কের সুফল যে একেবারেই আমরা পাবো না বা পাচ্ছি না, সেকথা অস্বীকার করছি না। কিন্তু কতটা পাচ্ছি, আর বিনিময়ে আমাদের সামগ্রিক ক্ষতিটা কী হচ্ছে সেটাও বিবেচনায় আনা দরকার। তবে আমাদের এটা অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে, প্রত্যেকটি বস্তুতে দুই-বিপরীতের ঐক্যের সহাবস্থান রয়েছে। ভালো-মন্দ, সুন্দর-অসুন্দর, উঁচু-নিচু, লম্বা-খাঁটো, আলো-আঁধার ইত্যাদি। অতএব, আমাদেরকেও ভালো-মন্দ বিবেচনা করাটা জরুরী এবং বিশেষ করে আমাদের মত পরাধীন জাতির মানুষের জন্য সেটা একান্তই আবশ্যক। বলি খেলায় যে তূলনামূলক কম বলবান, তাকে কৌশলী হতেই হয়। না হলে তার পরাজয় নিশ্চিত। আমরাও এক বলিখেলায় রত রয়েছি, যে বলি খেলায় আমরা তূলনামূলক কম বলবান। অতএব, কৌশলী, জ্ঞানী, বিচক্ষণ আমাদেরকেই হতে হবে। সীমান্ত সড়ক কিংবা বড় বড় ট্রানজিট দিয়ে কারো উন্নতি সাধন হয় না এবং হতেও পারে না। যদি তাই হতো তাহলে ঢাকা-শহরে এত উড়ালসেতু রয়েছে, তাতে ঢাকা শহরের বস্তিগুলোতে আর রাস্তার ধারে অসহায় মানুষের দেখা পাওয়া যেত না।

অতএব, বিষয়টা কেবল সড়কের নয়, উন্নয়নের নয়। বিষয়টা রাজনৈতিক অধিকারের,রাজনৈতিক ক্ষমতার এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদারিত্বের। এটা না পাওয়া পর্যন্ত আপনি পরাধীন, কর্তৃত্বাধীন, শোষিত, বঞ্চিত আর নিপীড়িত হয়েই থাকবেন।

সুতরাং, বোধোদয় হোক আমাদের…..