হিল ভয়েস, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদকঃ মধুপুর গড়াঞ্চলে বসবাসরত গারো, কোচ, বর্মণসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ মধুপুর শালবন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বনকে নিজেদের অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে আগলে রেখেছেন স্থানীয় আদিবাসীরা। তাদের দাবি—এই বন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি, জীবিকা, আবাদি জমি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।
‘উন্নয়ন’ নাকি উচ্ছেদের নীলনকশা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামাজিক বনায়ন, রাবার বাগান, জাতীয় উদ্যান, ইকোপার্ক, ইকো-ট্যুরিজম, কৃত্রিম লেক, ওয়াচ টাওয়ার ও পিকনিক স্পট নির্মাণের মতো প্রকল্পের আড়ালে প্রথাগত ভূমি থেকে আদিবাসীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বনবিভাগের নানা উদ্যোগে ইতোমধ্যে হাজার হাজার একর শালবন ধ্বংস হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
আদিবাসী নেতারা বলছেন, তারা উন্নয়নবিরোধী নন; কিন্তু উন্নয়নের নামে জীবন-জীবিকা ও সাংস্কৃতিক কাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জুমচাষ, আবাদি জমি ও সামাজিক ব্যবস্থাপনার ওপর এসব প্রকল্প সরাসরি প্রভাব ফেলছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
রক্তাক্ত ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলন
২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি মধুপুরে ইকোপার্ক বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রায় ৩ হাজার একর জায়গাজুড়ে ৬১ হাজার রানিং ফুট দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে হাজারো আদিবাসী শান্তিপূর্ণ মৌন মিছিলে অংশ নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মিছিলে পুলিশ ও বনরক্ষীরা গুলি চালালে শহীদ হন পীরেন স্নাল এবং উৎপল নকরেকসহ অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু আহত হন।
আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সেই ঘটনা আজও বিচারহীন। গিদিতা রেমা, সেন্টু নকরেক, নিন্তনাথ হাদিমা ও সেনা হেফাজতে নিহত চলেশ রিছিলের ঘটনাও তাদের কাছে একই ধারাবাহিকতার অংশ-যা তারা ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

গড়গড়িয়ায় ‘লেক সংস্কার’ নিয়ে নতুন উদ্বেগ
সম্প্রতি মধুপুর গড়াঞ্চলের আদিবাসী অধ্যুষিত গায়রা গ্রামের গড়গড়িয়া এলাকায় বনবিভাগ কর্তৃক কৃত্রিম “লেক সংস্কার” প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সম্মতি নেওয়া হয়নি।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এই প্রকল্পের ফলে আবাদি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এটি আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তারা অবিলম্বে প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত জমি চাষযোগ্য অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া এবং প্রকৃত মালিকদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানান।
“সম্মতি ছাড়া উন্নয়ন নয়”
স্থানীয় আদিবাসী ছাত্র-যুব ও সচেতন মহল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—মধুপুর শালবনে আদিবাসীদের সম্মতি ছাড়া কোনো কৃত্রিম উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে, আদিবাসীরা বাঁচলে বন বাঁচবে; বন রক্ষা করতে হলে প্রথাগত অধিকার স্বীকার ও সম্মান করতেই হবে।
মধুপুরের শালবন রক্ষা এবং আদিবাসীদের ভূমি-অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে তারা শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।
+ There are no comments
Add yours