হিল ভয়েস, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ঢাকা: সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও নারী ভোটারদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা নিশ্চিতে আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৩ ঘটিকার সময়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে নাগরিক সমাজের উদ্যোগে একটি মানববন্ধন আয়োজন করা হয়।
উক্ত মানববন্ধনে ছিলেন খুশী কবির, সমন্বয়ক, নিজেরা করি; জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ; বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মানীয় ফেলো, সিপিডি; নির্মল রোজারিও, সভাপতি, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান এসোসিয়েশন; মনীন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ; সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট; অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন; ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি; দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার ও আদিবাসী অধিকারকর্মী; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস; কাজল দেবনাথ, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ; গণস্বাক্ষরতা অভিযান এর পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীসহ প্রমুখ।

এই সময় নাগরিক সমাজের ব্যানারে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, আদিবাসী সংগঠন, নারী উন্নয়ন সংগঠন অংশগ্রহণ করে। মানববন্ধনে মূল বক্তব্য পাঠ করেন এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক জনাব শামসুল হুদা।
বক্তারা বলেন, আসন্ন ভোট পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও নারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৩ দিন বাকি। এ সময় প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ভোটের প্রচারণা তুঙ্গে রয়েছে। নির্বাচনী উত্তাপও যথেষ্ট বেড়ে চলছে। এরই মধ্যে আমরা বিভিন্ন অঞ্চল ও জেলা থেকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং নারী ভোটারসহ সমাজে যারা প্রান্তিক কিংবা সংখ্যায় অল্প তাদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন প্রকার হুমকি ও ভয়ভীতি ছড়ানো হচ্ছে বলে খবর পেয়েছি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলাগুলি থেকেই এই ধরনের হুমকি, সহিংসতার আশংকা ও ভয়ভীতি ছড়ানোর খবর বেশি আসছে।
মানববন্ধনে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ভোটকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে শুধু আদিবাসী, সংখ্যালঘু বা নারীরাই নন, প্রার্থীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটের যে পরিবেশ তৈরি করার কথা সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন, সরকার উভয়ই নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করছেন।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শঙ্কাহীন উপস্থিতি নিয়ে আজকে আমাদের এখানে মানববন্ধন করার কথা নয়। ভোটাধিকার নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিতে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হতে হবে।

খুশী কবির বলেন, সরকারের কাজ গণভোটে হ্যাঁ-না’ এর প্রচার করা নয়। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাজ হল সংখ্যালঘু, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নির্বাচন পূর্ব, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
মানববন্ধনে এএলআরডি এর নির্বাহী পরিচালক জনাব শামসুল হুদা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সাধারণ ভোটার বিশেষত সংখ্যালঘু নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মনের শংকা নিরসনে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইন শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের অবগতি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরেন-
১. নির্বাচন কমিশনে নারী, আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগ নির্বিঘ্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশনে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল আরো সক্রিয় করতে হবে। জেলা পর্যায়ে অনুরূপ সেল গঠন করে তা কার্যকর করতে হবে।
২. প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও নির্বাচনী এলাকায় যারা মাঠ পর্যায়ে আইন শৃংখলা রক্ষা এবং নির্বাচনী আইন বিধি মেনে চলার তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন তাদেরকে প্রতি ১২ ঘন্টা পর পর পরিস্থিতি এবং নারী, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভোটারসহ সকল প্রান্তিক অবস্থানে থাকা ভোটারদের নিরাপত্তাজনিত শংকা মনিটর করার জন্য নির্দেশ প্রদান করতে হবে।
৩. কোথাও কোনো প্রশাসনিক অথবা আইন শৃংখলা বাহিনীর কাউকে কোনো বিশেষ দলের পক্ষে প্রচার কিংবা অন্য কোন তৎপরতা চালাতে দেখা মাত্র তা নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষ মিডিয়া এবং নাগরিক সমাজের গোচরে আনতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. প্রতিটি জেলা , উপজেলা ও নির্বাচনী এলাকার কাছের কিংবা দূরের সকল নারী, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ভোটারসহ যাতে প্রবীণ-তরুণ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশা নির্বিশেষে সকল ভোটার নির্বিঘ্নে, নিরাপদে, তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তার জন্য প্রচার, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রশাসনকে গ্রহণ করতে হবে।
৫. সাধারণ মানুষের জন্য ভোট প্রদানের অধিকার একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। কোনো নাগরিকই যাতে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, তা সর্বাত্মক চেষ্টায় নিশ্চিত করতে হবে। আর নির্বাচন যাতে যথার্থ অর্থেই শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ এবং ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক হয় তার জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সাথে সাথে নাগরিকদেরও স্ব স্ব অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
৬. শুধু নির্বাচনের সময় বা ঐ দিনই নয়, নির্বাচনের পরও যাতে কোনো সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিত এবং বিশেষভাবে প্রান্তিক ও দুর্বল সামাজিক অবস্থানে থাকা নারীরা কোনো সহিংসতার শিকার না হন, কারো বাড়িঘর সম্পদ আক্রান্ত বা নষ্ট না হয়, তার পূর্ণ নিশ্চয়তা এখন থেকেই দিতে হবে এবং জনমনে আস্থা সৃষ্টির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. বিপুল সংখ্যক সুবিধা বঞ্চিত নারী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিত, প্রতিবন্ধীসহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিরাপদে যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার নিশ্চয়তা পায় এবং তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হয় সেই পরিবেশ সৃষ্টিতে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দলগুলির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সেই কথাও আমরা এই প্রসঙ্গে তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
৮. দিন শেষে আমরা যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অনুষ্ঠান দেখতে চাই তার নিশ্চয়তা বিধানে প্রত্যেকেরই সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে। এটি সকলের জাতির প্রতি অপরিহার্য অঙ্গীকার ও কর্তব্যেরই অংশ।
+ There are no comments
Add yours