হিল ভয়েস, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বিশেষ প্রতিবেদক: সম্প্রতি বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার ৩নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের জানালী পাড়ার জুম্ম গ্রামবাসীরা পার্শ্ববর্তী রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক হামলার শিকার হন এবং অন্তত ১৭ জন আহত হন।
গতকাল (৮ ফেব্রুয়ারি) উল্টো সেই হামলাকারী রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক হামলার শিকার জুম্মদের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে বান্দরবানের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যার চেষ্টা, জীবন নাশের হুমকি সহ নানা মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলার বাদী ফরিদুল আলম, পিতা: মৃত ফজল করিম, ঠিকানা: দক্ষিণ নয়াপাড়া, ৬নং ওয়ার্ড, আলীকদম। জুম্মদেরকে হামলায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদেরকেও মামলায় সাক্ষী রাখা হয়েছে।
উক্ত মামলায় যেসব নিরীহ জুম্মদেরকে আসামী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা হলেন: ১। উক্যজাই মারমা (সাবেক হেডম্যান), পিতা: সি সি মং মারমা, ২। সিয়ত ম্রো (দোকানদার), পিতা: অজ্ঞাত, ৩। লংছাং ম্রো (৪০), পিতা: পাচ্ছ ম্রো কার্বারি, ৪। পাচ্ছ ম্রো কার্বারি, পিতা: অজ্ঞাত, ৫। কংনং ম্রো, পিতা; মৃত তাইং ম্রো, ৬। চানথোয়াই ম্রো, পিতা: মৃত কাবা ম্রো, ৭। ধংরই ম্রো, পিতা: মৃত কাই তোর ম্রো, ৮। অমর ত্রিপুরা, পিতা: মৃত নয়া চন্দ্র ত্রিপুরা, ৯। চিং ইয়েক ম্রো, পিতা: কাইইং ম্রো, ১০। লাংসিং ম্রো, পিতা: মপম ম্রো। তারা সকলেই জানালী পাড়ার বাসিন্দা।
মামলায় অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণভাবে জুম্মদেরকে ‘পাহাড়ি ম্রো সম্প্রদায়ের অসভ্য ও সন্ত্রাসী শ্রেণির লোক’ বলে উল্লেখ করা হয়। মামলায় জুম্মদের বিরুদ্ধে ‘দা ও বাঁশের লাঠি দিয়ে বাদীর (অভিযোগকারী) ছেলেকে আক্রমণ করা, জাফর আলমকে হত্যার চেষ্টা সহ নানা মিথ্যা, সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হয় বলে ভুক্তভোগী জুম্মরা জানান।
উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ আলীকদম উপজেলার ৩ নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ড এর জানালী পাড়াস্থ স্কুলের পশ্চিম পার্শ্বে রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক জানালী পাড়ার ম্রো ও ত্রিপুরা আদিবাসীদের উপর দুই দফা হামলায় অন্তত ১৪ জন আহত ও ৩ জন গুরুতর আহত হন।
গ্রাামবাসীদের তথ্যমতে, উক্ত হামলায় অন্যতম নেতৃত্বদানকারী জাফর আলম (৪৫), পিতা: ফরিদুল ইসলাম, ৩ নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বলে জানা যায়। জাফর আলম একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তার বিরুদ্ধে আলীকদম থানায় একাধিক চুরির মামলা রয়েছে এবং মামলায় জেলও খেটেছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে প্রশাসনের লোক ধরে সে দেশের নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
উক্ত হামলার পর লংসান ম্রো বাদী হয়ে ১০ জনের নাম ও ৭/৮ জন অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে আলীকদম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযুক্তরা হলো: ১। জাফর আলম (৪৫) পিতা: ফরিদুল ইসলাম, ২। মফিজ উদ্দিন(২৫), ৩। জিয়া উদ্দিন (২১), উভয়ের পিতা: জাফর আলম, ৪। আলী মদন (৪০), পিতা: অজ্ঞাত, ৫। রিয়াজ উদ্দিন (৩৮), পিতা: মৌলভী আবু তৈয়ব, ৬। মোঃ জহির (২০), ৭। মোঃ মুবিন (২২), উভয়ের পিতা: মোঃ সিরাজ, ঠিকানা- দক্ষিণ নয়াপাড়া, ০৬ নং ওয়ার্ড, ৮। মোঃ ইস্কান্দার (৩৮), ৯। রেজাউল করিম (৩২), উভয়ের পিতা: ফরিদুল আলম, ১০। রহিমা খাতুন (৩০), স্বামী-ইস্কান্দার।
জানা যায়, জাফর আলম ও তার সঙ্গীরা দীর্ঘদিন ধরে ম্রো পাড়ার লোকজনের সৃজিত কলা বাগান থেকে কলা চুরি, গরু, ছাগল সহ বাগানের বিভিন্ন ফসলাদি ও খামারের হাসঁমুরগী চুরি করে আসছিল। গত ১৭ জানুয়ারি, আনুমানিক সকাল ৯.০০ ঘটিকার সময়ে জানালী পাড়ার লংসান ম্রো (৩০), পিতা-পাচ্ছ ম্রো কার্বারি এর কলা বাগান থেকে ৪টি কলার ছড়ি চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে এলাকার লোকজন হাতেনাতে ধরে ফেলে বেঁধে রাখে। পরে ঘটনার বিষয়ে ৩নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফোগ্য মার্মাকে অবহিত করা হলে তিনি চোরাইকৃত কলা ছড়ি সহ আসামী জাফর আলমকে পাড়ায় রাখতে নির্দেশ প্রদান করেন এবং তিনি এসে এর সমাধান করবেন আশ্বাস দেন। কিন্তু চেয়ারম্যান আসার পূর্বেই সকাল ১০টার দিকে জাফরের ছেলে মফিজ উদ্দিন(২৫), জিয়া উদ্দিন (২১) সহ ১০/১২ জন রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের নিয়ে লংসান ম্রো’র বাড়িতে হামলা করে কয়েকজন জুম্মকে আহত করে এবং জাফরকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে জুম্ম গ্রামবাসীরা দুইটি টমটমে করে থানা হতে গ্রামে ফেরার পথে নয়া পাড়া কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে ২৫/৩০ জনের অধিক সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী কর্তৃক ধারালো দা, লোহার রড, ছুরি ও লাঠিসোটা দিয়ে অতর্কিত হামলার শিকার হন। উভয় ঘটনায় অন্তত ১৭ জন জুম্ম আহত হন।
+ There are no comments
Add yours