হিল ভয়েস, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ঢাকা: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতিশ্রুতি ও পাহাড়ের দূরবর্তী এলাকার ভোটারদের এবং সমতলের আদিবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে আজ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল ১১ ঘটিকায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন- এর আয়োজনে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন সংগঠনের যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন।
মূল বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসীরা দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনুন্নত অবকাঠামো এবং নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করছেন। ফলে তারা জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও নির্বাচনে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব, নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশির কারণে বহু আদিবাসী ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, আদিবাসীদের সমস্যা জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। পাশাপাশি তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আদিবাসী ভোটারদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন আইনে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের সুযোগ না থাকায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি এই আইন সংশোধনের দাবি জানান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান।
আদিবাসী অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমিলা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, সহিংসতা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। তিনি আদিবাসী নারী ও জনগণের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আদিবাসীদের সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী ভোটারদের জন্য আবাসন, যাতায়াত সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, সামরিক কর্তৃত্বের অবসান, ভূমি কমিশন কার্যকর করা এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি উত্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে আদিবাসী জনগণের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
এই সময় অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে নিম্নোক্ত দাবিসমূহ জানানো হয়:
১. দূরবর্তী পাহাড়ের আদিবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণে ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে আবাসনসহ খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা; এবং
২. সমতল ও পাহাড়ে ভোটকেন্দ্রগামী সকল আদিবাসী ভোটারদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং অযথা হয়রানি বন্ধ করা।
একই সাথে নির্বাচনপন্থী সকল রাজনৈতিক দলসমূহ ও আগামী সরকারের কাছে নিম্নে প্রত্যাশা ও দাবিসমূহ হলো:
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচী ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এই চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করা;
২. পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান করতে হবে;
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিকীকরণ ও স্থানীয় শাসন নিশ্চিতকরণে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক যথাযথ ক্ষমতায়ন করা;
৪. পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’কে কার্যকরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত থেকে প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাঁদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা;
৫. দেশের মূলস্রোতধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা;
৬. ইউনিয়ন পরিষদসহ সকল স্তরের স্থানীয় সরকারে সমতলেরর আদিবাসীদের জন্য বিশেষ আসন সংরক্ষণ ও আদিবাসী জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা; এবং
৭. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।