খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সেটেলার-রোহিঙ্গা কর্তৃক আদিবাসীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে পিসিপি’র বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

হিল ভয়েস, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, চট্টগ্রাম: “অবিলম্বে রোডম্যাপ ঘোষণাপূর্বক পার্বত্য চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন কর” স্লোগানে বান্দরবানের আলীকদমে ম্রো আদিবাসীদের ওপর রোহিঙ্গা ও সেটেলার কর্তৃক দুই দফায় সন্ত্রাসী হামলা এবং খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক ভূমি বেদখল ও আদিবাসীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল, মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকাল ৩:০০ ঘটিকায় চট্টগ্রাম মহানগরের চেরাগী মোড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের (পিসিপি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা ও পাহাড়ী শ্রমিক কল্যাণ ফোরামের যৌথ উদ্যোগে এক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করা হয়।

উক্ত সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন, পাহাড়ী শ্রমিক কল্যাণ ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক প্রসেনজিৎ চাকমা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি শুভ দেবনাথ, পিসিপির চবি শাখার সাধারণ সম্পাদক রিবেক চাকমা, চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সুমান চাকমা, চবি শিক্ষার্থী কথি ম্রো প্রমুখ।

পিসিপির চবি শাখার সভাপতি অন্বেষ চাকমার সভাপতিত্বে ও পিসিপির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপির চবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক প্রেনঙি ম্রো।

এই সময় প্রসেনজিৎ চাকমা বলেন, পাহাড়ে অন্যায় নিপীড়নের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, অথচ প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। পার্টি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তার লড়াই সংগ্রাম জারি রেখেছে। এমন কোনো দিন বাদ যায়নি যেদিন কোথাও না কোথাও পাহাড়ের মানুষ নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়নি। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এদেশের অখন্ডতার প্রতি সম্মান রেখে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। আমাদের সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে।

শুভ দেবনাথ বলেন, বাঙালি জাতি দীর্ঘ দুই দশক পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক নিপীড়নের শিকার হয়েছে। অথচ তারা নিজেরাই পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী জনগণের ওপর শোষণ-নিপীড়ন বহাল রেখেছে। রাষ্ট্র স্বয়ং পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এই সময়ে এসে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা না করে আদিবাসীদের ভূমি কেড়ে নেয়া হচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে, শোষণ নির্যাতন জারি রাখা হচ্ছে যা রাষ্ট্রের জন্য শুভকর নয়।

তিনি আরো বলেন, ছোট্ট একটা শব্দ আদিবাসী। শাসকগোষ্ঠী সেটাকে ভয় পায়। এদেশের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তাদের মুছে ফেলতে চায়, অস্বীকার করতে চায়। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে আত্মপরিচয়ের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা নিপীড়নের শিকার হয়েছে, লড়াই সংগ্রাম করেছে। তাদের অধিকার বঞ্চিত করে দমিয়ে রাখা যাবে না।

রিবেক চাকমা বলেন, শহরাঞ্চল কিংবা প্রান্তিক এলাকা সর্বত্র জুম্ম জনগণের অধিকারকে খর্ব করা হচ্ছে। আলীকদম ও কমলছড়ির ঘটনায় প্রশাসন বরাবরের মতো অদায়িত্বশীল আচরণ, আদিবাসীদের নিয়ে রাষ্ট্র যন্ত্রের আসল চরিত্র উন্মোচন করেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র স্বয়ং সন্ত্রাস উৎপাদন করে পাহাড়ের সমস্যাকে জিইয়ে রেখেছে। সেখানে পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সেখানকার স্থানীয় প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতায়ন করা হয়নি। উপরন্তু পূর্বের ন্যায় সামরিক শাসন জারি রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একদিকে রাষ্ট্র ন্যায্য অধিকারের জন্য কথা বলা আদিবাসীদের সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা লাগিয়ে দিচ্ছে। অপরদিকে সার্বভৌমত্বের পরোয়া না করে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে। এসব সংগঠন ও রোহিঙ্গারা পাহাড়েও তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু করেছে। তিনি অতিদ্রুত খাগড়াছড়ির কমলছড়ি ও আলীকদমে আদিবাসীদের ওপর সংঘটিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিচারের দাবি জানান।

সুমান চাকমা বলেন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের উপর হামলার প্রত্যকটি ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী কিংবা প্রশাসন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় আলীকদম থানার অফিসার ইনচার্জ ম্রো সম্প্রদায়ের ভুক্তভোগীদের থানায় ডেকে প্রতারণা করেন এবং সেখান থেকে ফেরার পথে তারা পুনরায় হামলার শিকার হন। পাহাড়ের আদিবাসীদের উপর যুগ যুগ ধরে এ ধরনের অন্যায় নিপীড়ন চলমান রয়েছে। তিনি দেশের সকল স্তরের জনগণকে আদিবাসীদের ওপর চলমান নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

কথি ম্রো বলেন, আলীকদমে পুনঃপুন হামলা সংঘটিত হওয়ার ঘটনা প্রশাসনের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে। থানা থেকে ফেরার পথে রাস্তার মাঝখানে হামলা করা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে যা কখনোই কাম্য নয় এবং সেখান থেকে এদেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশাসনকে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এই সময় সমাবেশ শেষে একটি মিছিল চেরাগি মোড় থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বর ঘুরে পুনরায় চেরাগি মোড়ে এসে সমাপ্ত হয়।

More From Author

+ There are no comments

Add yours