আলীকদমে রোহিঙ্গা ও সেটেলার সন্ত্রাসী কর্তৃক ম্রোদের উপর হামলা, আহত অন্তত ১৭ জন

হিল ভয়েস, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, বান্দরবান: গতকাল রোজ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বান্দরবান জেলাধীন আলীকদম উপজেলার ৩ নং নয়াপাড়া ইউনিয়ন ও ৯ নং ওয়ার্ড জানালী পাড়াস্থ স্কুলের পশ্চিম পার্শ্বে রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের যোগসাজশে জানালী পাড়ার ম্রো আদিবাসীদের উপর দুই দফা হামলায় অন্তত ১৪ জন আহত ও ৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।

আহত ব্যক্তিরা হলেন, ১)লংসান ম্রো (৩০) পিতা-পাচ্ছ ম্রো কার্বারি; ২)অংসং ম্রো (৩০), পিতা: কটঙং ম্রো; ৩)কটঙং ম্রো (৫০), পিতা: কাই ইন ম্রো; ৪)লাংচিং ম্রো; ৫)কাইনপা ম্রো; ৬) ঙানওয়াই ম্রো (২৭), পিতা: দন রুই ম্রো; ৭) মেনরু ম্রো মেনরু ম্রো (৪০), পিতা: খাইন দই ম্রো; ৮) থংইয়া ম্রো; ৯)চিংইয়ক ম্রো; ১০)বাংতাক ম্রো; ১১)কাংওয়াই ম্রো; ১২) শানতই ম্রো; ১৩) ধংরই স্রোকে; ১৪) লাংছিং ম্রো (৩০), পিতা: মপম ম্রো।

গুরুতর আহতরা হলেন: ১) অমর ত্রিপুরা (৫০), পিতা: নয়া চন্দ্র ত্রিপুরা; ২)ডাংয়া ম্রো (৫২), পিতা: মেনসা ম্রো; ৩) প্রেকিক্য ম্রো (২৬), পিতা: মাংইন ম্রো;

ছবি: রোহিঙ্গা ও সেটেলার সন্ত্রাসী কর্তৃক ম্রোদের উপর হামলা

গ্রামবাসীদের তথ্য মতে, অভিযুক্ত জাফর আলম (৪৫) পিতা-ফরিদুল ইসলাম, ৫ নং ওয়ার্ড ও ৩ নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বলে জানা যায়। জাফর আলম একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তার বিরুদ্ধে আলীকদম থানায় একাধিক চুরির মামলা রয়েছে এবং মামলায় জেলও খেটেছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে প্রশাসনের লোক ধরে সে দেশের নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ম্রো পাড়ার লোকজনের সৃজিত কলা বাগান থেকে কলা চুরি, গরু, ছাগল সহ বাগানের বিভিন্ন ফসলাদি ও খামারের হাসঁমুরগী সে চুরি করে আসছিল। পরবর্তীতে গতকাল রোজ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) আনুমানিক সকাল ৯.০০ ঘটিকার সময়ে জানালী পাড়ার লংসান ম্রো (৩০) পিতা-পাচ্ছ ম্রো কারবারী কলা বাগান থেকে ৪টি কলার ছড়ি চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে এলাকার লোকজন হাতেনাতে ধরে ফেলে বেঁধে রাখে। পরে ঘটনার বিষয়ে ৩ নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফোগ্য মার্মাকে অবহিত করা হলে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে চোরাইকৃত কলা ছড়ি সহ আসামী জাফর আলমকে পাড়ায় রাখতে নির্দেশ প্রদান করে। পরে চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পূর্বে সকাল ১০ ঘটিকার সময়ে তার ছেলে মফিজ উদ্দিন(২৫), জিয়া উদ্দিন (২১) সহ ১০/১২ জন রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের নিয়ে লংসান ম্রো’র বাড়িতে হামলা করে। এই সময় তাদের বাঁধা প্রদান করতে গেলে প্রেকিক্য ম্রো(২৬), অংসং ম্রো (৩০) উভয়কে বেঢড়ক মারধর করে বাম চোখের উপরিভাগে, মুখে, বুকে, পিটে জখম করে। একপর্যায়ে রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিরা সন্ত্রাসী কায়দায় জাফর আলমকে সেখান থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং প্রেক্য ম্রো ও অংচং ম্রোকে আহত অবস্থায় গ্রামবাসীরা আলীকদম সরকারী হাসপাতালের নিয়ে যায়।

এই ঘটনার পর লংসান ম্রো ও গ্রামবাসীদেরকে রোহিঙ্গা ও সেটেলার বাঙালিদের কর্তৃক প্রাণ নাশের হুমকি প্রদান করা হয়। পরে জানালী পাড়ার ম্রো আদিবাসীরা নিজেদের নিরাপত্তা আশংকা ভেবে স্থানীয় চেয়ারম্যান সহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অবহিত করে আলীকদম থানায় একটি মামলা দায়ের করে। পরে সকাল ১১ ঘটিকার সময়ে গ্রামবাসীদের আলীকদম থানায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিলে তারা গ্রামে ফিরে যান।

পরবর্তীতে বিকাল আনুমানিক ৫ ঘটিকার সময়ে আলীকদম থানার পক্ষ থেকে মুঠোফোনে গ্রামবাসীদের থানায় যেতে বলা হয়। গ্রামবাসীরা সেখানে উপস্থিত হলে ওসি জানান, তাদের ভুল নম্বরে কল করা হয়েছে। পরে সন্ধ্যা আনুমানিক ৭ ঘটিকার সময়ে গ্রামবাসীরা দুইটি টমটমে করে থানা হতে গ্রামে ফেরার পথে নয়া পাড়া কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে ২৫/৩০ জনের অধিক সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী কর্তৃক ধারালো দা, লোহার রড, ছুড়ি ও লাঠিসোটা নিয়ে রাস্তা গতিরোধ করে তাদের বিরুদ্ধে আতর্কিত হামলা করে। এতে টমটম গাড়িতে থাকা ১৮ জনের মধ্যে ৮ জন গুরুতর আহত হন।

পরে লংসান ম্রো , অমর ত্রিপুরা, ডাইয়া ম্রো, প্রেকিক্য ম্রো , অংসং ম্রো, কটঙং ম্রো, লাংচিং ম্রো, কাইনপা ম্রো, ঙানওয়াই ম্রো, মেনরু ম্রো, থংইয়া ম্রো, চিংইয়ক ম্রো, বাংতাক ম্রো, কাংওয়াই ম্রো, শানতই ম্রো, ধরেই ম্রোসহ সকলকে আহত অবস্থায় আলীকদম সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ডাংইয়া ম্রো ও অমর ত্রিপুরা, প্রেকিক্য ম্রো’র অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদেরকে তাৎক্ষনিকভাবে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

ছবি: রোহিঙ্গা ও সেটেলার সন্ত্রাসী কর্তৃক ম্রোদের উপর হামলা

সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ম্রো আদিবাসীদের কাছ থেকে ৪টি মোবাইল, ডাংইয়া ম্রো থেকে ২০,০০০/-(বিশ হাজার) টাকা, অমর ত্রিপুরা থেকে ৮,০০০/-(আট হাজার) টাকা, কটনং ম্রো থেকে ৭০০০/-(সাত হাজার) টাকা জোরপূর্বক নিয়ে যায় বলে জানা যায়।

এই সময় লংসান ম্রো বাদী হয়ে ১০ জনের নাম ও ৭/৮ জন অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে আলীকদম থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

অভিযুক্তরা হলো: ১। জাফর আলম (৪৫) পিতা- ফরিদুল ইসলাম, ২। মফিজ উদ্দিন(২৫), ৩। জিয়া উদ্দিন (২১), উভয়ের পিতা- জাফর আলম, ৪। আলী মদন (৪০), পিতা-অজ্ঞাত, ৫। রিয়াজ উদ্দিন (৩৮), পিতা-মৌলভী আবু তৈয়ব, ৬। মোঃ জহির (২০), ৭। মোঃ মুবিন (২২), উভয়ের পিতা-মোঃ সিরাজ, সর্বসাং- দক্ষিণ নয়াপাড়া, ০৬ নং ওয়ার্ড, ৮। মোঃ ইস্কান্দার (৩৮), ৯। রেজাউল করিম (৩২), উভয়ের পিতা-ফরিদুল আলম, ১০। রহিমা খাতুন (৩০), স্বামী-ইস্কান্দার।

আলীকদম থানা থেকে আবারও আজ রোজ রবিবার (১৮ জানুয়ারি) গ্রামবাসীদের থানায় যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। গ্রামবাসীরা যেতে অনীহা প্রকাশ করলে থানার ওসি মামলার কাগজ সংশোধনের কারণ জানান।

উক্ত রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ এখনো কোনো অভিযুক্তকে ধরতে পারেনি বলে জানা গেছে।

ছবি: আলীকদম থানায় মামলার কপি

More From Author