বাঘাইছড়িতে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র ভাস্কর্য উন্মোচন এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

হিল ভয়েস, ৯ নভেম্বর ২০২৫, রাঙ্গামাটি: আজ ৯ নভেম্বর ২০২৫ সকাল ১০ ঘটিকায় বাঘাইছড়ির সার্বোয়াতুলি ইউনিয়নের শিজক কলেজ সংলগ্ন কলেজ পাড়ায় জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক সাংসদ মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র ভাস্কর্য (আবক্ষ মূর্তি) উন্মোচন উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার এবং ভাস্কর্য উন্মোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও কাচালং ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ দেব প্রসাদ দেওয়ান, শিজক কলেজের অধ্যক্ষ সুভাষ দত্ত চাকমা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক শান্তনা তালুকদার।

অনুষ্ঠানের শুরুতে এম এন লারমা’র আবক্ষ মূর্তিটি উন্মোচন করেন এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা। একই সময়ে এম এন লারমার আবক্ষ মূর্তি উদ্বোধনের দিনটিকে (৯ নভেম্বর) স্মরণীয় রাখতে এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মহান নেতার স্মরণে ‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্মারক সংকলন’ নামে একটি প্রকাশনা বের করা হয়।

উক্ত এন লারমা ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন ভাস্কর্যশিল্পী ও আর্ট কিউরেটর জিংমুন লিয়ান বম। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁর শিল্পকর্মে পাহাড়ি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানবিকতার ছোঁয়া প্রতিফলিত হয়। এই ভাস্কর্যটি নির্মাণের মাধ্যমে তিনি শুধু একজন ঐতিহাসিক নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাননি, বরং পাহাড়ি মানুষের সংগ্রামী চেতনারও শিল্পিত প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

আলোচনা সভায় ঊষাতন তালুকদার বলেন, যে জাতি ত্যাগ স্বীকার করতে জানে না, সে জাতি বাঁচতে পারে না। যাঁরা মরতে জানে, তাদেরকে সবাই ভয় করে। সব জাতি সমীহ করে। এখন সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখলেও এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে, তাঁরা একসময় বাধ্য হয়েছিল আমাদের সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে।

আমি নিজের কানে শুনেছি, জেনারেল মঞ্জু নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন “শান্তিবাহিনীরা শৃঙ্খলিত, সুসংগঠিত এবং আমরা রণ-ক্লান্ত। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটা আমাদের রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই।” এরপর তাঁরা বাধ্য হয় আমাদের সাথে চুক্তিতে উপনীত হতে।

তিনি বলেন, তারা(বাংলাদেশ সরকার) ঈমানদারি মানুষ। ধর্মের ভাষায় তারা বলে ঈমানদার। কিন্তু চুক্তি করে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না করে তারা ঈমান রক্ষা করতে পারেনি। তারা ঈমানের সাথে বেঈমানী করেছে।

তিনি আরো বলেন, জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত মহান নেতা এম এন লারমা এবং তাঁর পরিবারটাই ছিল শিক্ষিত এবং ঘূণেধরা, ক্ষয়িষ্ণু সামন্তীয় জুম্ম সমাজ ব্যবস্থা থেকে জুম্মদের উত্তরণের জন্য নিজেদের মূল্যবান সময়কে উৎসর্গকারী একটা আদর্শ পরিবার। এছাড়া সামগ্রিকভাবে তাঁদের গোটা পরিবারটাই আগাগোড়া রাজনৈতিক মহান কর্মকাণ্ডে জড়িত।

তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা জুম্মরা কী পারিনা? আমাদের তরুণরা কী পারেনা? আমরা সবকিছু পারি। আমরা করে দেখিয়েছি। আপনাদেরকে স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কাজে নামতে হবে।

বিজয় কেতন চাকমা বলেন, এম এন লারমার আদর্শ, তাঁর জ্ঞান, আমাদের অন্তরের অন্ত:স্থলে ধারণ করে আমরা আমাদের প্রজন্মকে নতুনভাবে পুনর্জন্ম, নতুনভাবে অনুপ্রাণিত আমরা যতটুকু পেরেছি, বাকিটা তারা কাঁধে নেবে, এই দায়িত্ব তাদেরকে অর্পণ করার অভিপ্রায় নিয়ে আমি আজকে ৭৮ বছরের বৃদ্ধ, শারীরিক অসুস্থতায় থেকেও জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার অনুরোধ বা আদেশকে আমি উপেক্ষা করতে না পেরে বাঘাইছড়িতে ভাস্কর্যটা নির্মাণের কাজ সমাপ্তির উদ্যোগ নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, সাধারণভাবে এই ভাস্কর্যটা দেখলে ইট-কংক্রিট-সিমেন্ট ছাড়া কিছুই নয়। আর যদি একটু গভীরে গিয়ে দেখি, তাহলে আমাদের সামনে লারমার চেহারা ভেসে উঠবে। আর যদি আমরা আরও গভীরে গিয়ে দেখি তাহলে প্রকৃতভাবে লারমার চেহারা, তাঁর জীবন, তাঁর আদর্শ আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।

তাহলে আমরা দেখতে পাবো, লারমা প্রয়াত হওয়ার ৪২ বছর পরেও, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও, লারমার চিন্তা, চেতনা, আদর্শ কতখানি গ্রহণযোগ্য, কতখানি প্রাসঙ্গিক।

দেবপ্রসাদ দেওয়ান বলেন, এম এন লারমাকে শুধুমাত্র তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসীদের একজন নেতা হিসেবে ভাবলে বা মনে করে থাকলে সেটা দ্বারা আমাদের সংকীর্ণ মানসিকতার প্রকাশ পাবে। শৈশব থেকে আমৃত্যু যদি আমরা এম এন লারমার জীবনকে অধ্যয়ন করি তাহলে দেখতে পাবো, তিনি বাংলাদেশের সকল অবহেলিত, উপেক্ষিত, খেটে-খাওয়া ও মেহনতী মানুষের হয়ে, নারীদের হয়ে কথা বলেছেন। তাই এই ভাস্কর্য সেই সকল মানুষের প্রতীক। তাঁর আদর্শের প্রতীক। তাঁর সংগ্রাম ও চেতনার প্রতীক।

তিনি বলেন, মাঝে মাঝে এই রাষ্ট্রকে আমাদের মত যাঁরা ছোট ছোট জাতি রয়েছে তাঁদের উপর প্রায়শই করুণা দেখাতে দেখি। কিন্তু রাষ্ট্রকে আমরা বলতে চাই, আমাদের করুণার দরকার নেই, আমাদের দরকার অধিকার। আমাদেরকে অধিকার দিন, করুণা নয়।

তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিগত আওয়ামী সরকারের পতন হয়েছে। বলা হচ্ছে বিগত সরকার পতনের মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থারও বিলোপ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এখানে স্রেফ সরকার বদল হয়েছে। তার যে পুরনো ব্যবস্থাপনা, যে শাসন ব্যবস্থা সেটা এখনো আগের মত রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় যে শাসন-কাঠামো সেটার এখনো সুন্দর বদল ঘটেনি। দেশে এখনো বৈষম্য কমেনি। এখনো আদিবাসী ও দেশের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ঘরপোড়া বন্ধ হয়নি। তাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ হয়নি।

শান্তনা তালুকদার বলেন, মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নারী অধিকার নিয়ে ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। তিনি সংসদে গিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অধিকারের কথা বার বার উত্থাপিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি অবহেলিত, নির্যাতিত এবং নিষিদ্ধ পল্লীর নারীদের কথাও সংসদে উত্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় জুম্ম নারী সমাজকে পুরুষের আধিপত্য ও পারিবারিক দাসত্ব থেকে মুক্তির তাগিদে সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালে এম এন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের নারীরা এখনো ঘরের চারদেয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করতে পারেনি। কিন্তু আজকে বাস্তবতা দাবি করছে, আমাদের নারীদের সেই বন্দীদশা থেকে মুক্তিলাভ করতে হবে। মহান নেতার সাম্যবাদী আদর্শকে ধারণ করে জুম্ম জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি আমাদের নারী সমাজকেও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

পুলক জ্যোতি চাকমার সভাপতিত্বে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বাঘাইছড়ি থানা শাখার সভাপতি চিবরন চাকমার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভাস্কর্য নির্মাণ কমিটির সম্মানিত সদস্য সচিব ত্রিদীপ চাকমা(দীপ)।

More From Author